দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে নতুন মন্ত্রিসভা
ফেব্রুয়ারি ১৯ ২০২৬, ২৩:৪৩
ফাহিম ফিরোজ, বরিশাল ॥ স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে পিছিয়ে থাকা দক্ষিণাঞ্চল এবার নতুন আশায় বুক বাঁধছে। তারেক রহমানের নবগঠিত মন্ত্রিসভায় দক্ষিণাঞ্চলের দুজন সংসদ সদস্য পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী এবং তিনজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় উপকূলীয় এই জনপদে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন উন্নয়ন। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, এই প্রতিনিধিত্ব যদি বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়, তবে বদলে যেতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের ভাগ্য।
দক্ষিণাঞ্চল শুধু সমস্যার জনপদ নয়, এটি সম্ভাবনার ভূখণ্ডও। সমুদ্র, নদী, গ্যাস, কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনের সমন্বয়ে পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে অঞ্চলটি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
কী চান দক্ষিণের মানুষ?
সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে জরুরি ভিত্তিতে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেতে হবে, সেগুলো হলো- নদী ভাঙন রোধ ও টেকসই বেরিবাঁধ নির্মাণ ও নদী খনন, কুয়াকাটা পর্যন্ত ছয় লেন সড়ক ও রেল সংযোগ, কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরীতে রূপান্তর, ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে বরিশালে শিল্পকারখানা স্থাপন, ভোলা-বরিশাল সেতু ও মীরগঞ্জ সেতুর দ্রুত বাস্তবায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন ও যুবকদের কর্মসংস্থান, বরিশাল নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন, সড়ক সংস্কার ও নাগরিক সেবার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, বিশেষ করে ভোলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপন, বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আধুনিকায়ন।
নদীভাঙনে টিকে থাকার লড়াই:
হিজলা উপজেলার নদীভাঙন কবলিত এলাকার বাসিন্দা হাবিবুল্লাহ জানান, গত কয়েক বছরে তার পরিবারের কয়েক বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে ঘুমাতে যাই। কখন বাড়িঘর নদীতে চলে যায় সেই ভয় থাকে। বর্ষাকালে অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়। শুধু ত্রাণ দিলে হবে না, স্থায়ীভাবে নদী শাসন ও শক্ত বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। না হলে আমরা বারবার ঘরছাড়া হবো।”
বাজারদর নিয়ন্ত্রণই প্রধান দাবি:
বরিশাল নগরীর রিকশাচালক কালাম (৪০) প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে সংসার চালান। দুই সন্তানের জনক কলাম বলেন, “আগে যা আয় করতাম তাতে কোনোমতে চলত। এখন চাল, ডাল, তেল-সবকিছুর দাম বেড়েছে। ইনকাম বাড়েনি, কিন্তু খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। দিন শেষে হাতে কিছুই থাকে না। বাজারদর নিয়ন্ত্রণ আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া।”
বিভাগীয় শহরে নাগরিক সুবিধার ঘাটতি:
নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন (৪৮) একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, “বরিশাল বিভাগীয় শহর হলেও অনেক মৌলিক সুবিধা এখনো অপর্যাপ্ত। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। অনেক রাস্তা ভাঙাচোরা। নাগরিক ট্যাক্স বাড়ছে, কিন্তু সেবার মান সে অনুযায়ী বাড়ছে না। নগর পরিকল্পনা করে উন্নয়ন করতে হবে।”
যোগাযোগ ও শিল্পায়নে পিছিয়ে গ্রামাঞ্চল:
বাকেরগঞ্জ উপজেলার ভাতশালা গ্রামের সাইয়্যেদুর রহমান সন্যামত (৫০) বলেন, “২০২৬ সালেও আমাদের অনেক এলাকায় সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত নয়। শিল্পকারখানা না থাকায় যুবকদের কাজের জন্য বাইরে যেতে হয়। নদীর ওপর সেতু হলে এবং এখানে শিল্প স্থাপন হলে এলাকার অর্থনীতি বদলে যাবে। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।”
স্বাস্থ্যসেবায় জরুরি পরিবর্তন দরকার:
চরফ্যাশন থেকে আসা এক রোগীর স্বজন জানান, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের প্রায়ই বরিশালে নিয়ে আসতে হয়। তিনি বলেন, “ভোলায় যদি মেডিকেল কলেজ ও উন্নত হাসপাতাল থাকত, তাহলে এত দূরে আসতে হতো না। অনেক সময় রোগী পথে কষ্ট পায়। স্বাস্থ্যসেবা দেরি হলে জীবনও চলে যেতে পারে।”
সুধিজনের মত:
বরিশাল জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আযাদ আলাউদ্দীন বলেন, “দক্ষিণাঞ্চল বছরের পর বছর ধরে অবহেলার শিকার। বাজেট এলেও তার সুষম বণ্টন হয়নি, প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে গতি ছিল না। এখন মন্ত্রিসভায় দক্ষিণাঞ্চলের শক্ত প্রতিনিধিত্ব তৈরি হয়েছে-এটি বড় সুযোগ। কিন্তু শুধু পদ-পদবি পেলেই হবে না, দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে। নদীভাঙন রোধে স্থায়ী নদী শাসন, শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রে উন্নীত করা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো-এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি আরও বলেন, উন্নয়নের নামে যেন লুটপাট, দুর্নীতি ও দলীয়করণ না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে। দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নকে রাজনৈতিক ইস্যু নয়, জাতীয় অগ্রাধিকারের ইস্যু হিসেবে দেখতে হবে। এখনই যদি সঠিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে কাজ শুরু না হয়, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা হতাশায় পরিণত হবে।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, “দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান জরুরি। পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিবেচনায় রেখে নদী শাসন, শিল্পায়ন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। জেলাভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রেল সংযোগের দিকেও নজর দিতে হবে।”
প্রত্যাশা এখন বাস্তব পদক্ষেপে:
দক্ষিণাঞ্চলবাসীর প্রত্যাশা-মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব যেন কেবল রাজনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব উন্নয়নে প্রতিফলিত হয়। নদীভাঙন রোধ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, পর্যটন উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার এখনই সময় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের কাছে এখন উপকূলবাসীর একটাই বার্তা—প্রতিশ্রুতি নয়, চাই কার্যকর বাস্তবায়ন।









































