১০ উপজেলা ও সিটি এলাকায় নিরাপদ পানি-স্যানিটেশনে বড় চ্যালেঞ্জ
বরিশালে বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের সংকট
সেপ্টেম্বর ২১ ২০২৬, ২২:৩৮
ফাহিম ফিরোজ : একদিকে বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির সংকট, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধার অভাব। বরিশালের গ্রামীণ জনপদ থেকে শুরু করে নগর এলাকার মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের এ দুই সমস্যা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। নদী-খালবেষ্টিত বরিশালে বর্ষা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে অনেক মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের অভাবও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। সমগ্র দেশের নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় বরিশাল জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় জেলার হতদরিদ্র পরিবারের জন্য প্রায় ৬ হাজার স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণ করা হবে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বলছেন, প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বরিশালের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বাড়ার পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের স্যানিটেশন ব্যবস্থায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করতে সঠিক স্থান নির্বাচন, প্রকৃত উপকারভোগী বাছাই এবং নির্মিত অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতি ইউনিয়নে ৮টি গভীর নলকূপ:
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ৮টি করে গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পানির স্তর, এলাকার প্রয়োজনীয়তা ও মানুষের চাহিদা বিবেচনা করে নলকূপ স্থাপনের স্থান নির্ধারণ করা হবে। বরিশালের বিভিন্ন গ্রাম ও প্রত্যন্ত ইউনিয়নে নিরাপদ পানির সংকট দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেলে অনেক এলাকায় সাধারণ নলকূপে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না। কোথাও আবার পানির মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ফলে অনেক পরিবারকে দূরের উৎস থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়।
উপকূলীয় ও চরাঞ্চলে সংকট বেশি:
বরিশাল সদর, বাকেরগঞ্জ, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ, মুলাদীসহ নদী ও চরাঞ্চলঘেঁষা বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট তুলনামূলক বেশি। বর্ষা ও জলোচ্ছ্বাসের সময় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হলে অনেক নলকূপ ও ল্যাট্রিন পানিতে তলিয়ে যায়। এতে একদিকে নিরাপদ পানির উৎস সংকুচিত হয়, অন্যদিকে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা ও অন্যান্য দূষণের কারণে কোথাও কোথাও নলকূপের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।
নগরীতেও পানির সংকট:
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায়ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা রয়েছে। নগরীর পানির সংকট নিরসনে রূপাতলী ও বেলতলা এলাকায় সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘ সময় নানা জটিলতায় এসব প্ল্যান্ট প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর ছিল না। সম্প্রতি রূপাতলী-১ সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট পুনরায় চালু করা হয়েছে। এর ফলে নগরীর পানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়নের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নগরীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার তুলনায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
পানির মান পরীক্ষা নিয়েও উদ্বেগ:
বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পাশাপাশি পানির মান পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বরিশালে পানির মান পরীক্ষার সরকারি ব্যবস্থায়ও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। পরিবেশ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক গবেষণাগারের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকায় দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে বিভিন্ন উৎসের পানি ব্যবহারের উপযোগিতা সম্পর্কে দ্রুত নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা ও বন্যার সময় পানির উৎস দূষিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এ সময়ে নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা করা না গেলে দূষিত পানি ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
স্যানিটেশনেও পিছিয়ে বরিশাল:
নিরাপদ পানির পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বরিশালের চিত্র উদ্বেগজনক। জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বরিশাল বিভাগ দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোর অনেকেই এখনো স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কোথাও কাঁচা ল্যাট্রিন, কোথাও অপরিকল্পিত টয়লেট এবং কোথাও আবার টয়লেট থাকলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা নেই। নদীমাতৃক বরিশালে বর্ষা ও জলোচ্ছ্বাসের সময় এসব ল্যাট্রিন তলিয়ে গেলে মলমূত্রের সঙ্গে পানির মিশ্রণ ঘটে। এতে আশপাশের পুকুর, খাল ও অন্যান্য পানির উৎস দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
হতদরিদ্রদের জন্য ৬ হাজার টয়লেট:
স্যানিটেশন সংকট মোকাবিলায় জেলার হতদরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য প্রায় ৬ হাজার স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্কুল ও জনসমাগমস্থলেও ঘাটতি:
জেলার বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকার স্কুল, বাজার ও জনসমাগমস্থলে পর্যাপ্ত ও ব্যবহারোপযোগী স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এ সংকট আরও বেশি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়া অনেক এলাকায় টয়লেট থাকলেও তা ব্যবহারের উপযোগী নয়। কোথাও পানির ব্যবস্থা নেই, কোথাও বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে নির্মিত অবকাঠামো থাকলেও কাঙ্ক্ষিত স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত হচ্ছে না।
নদী-খাল দূষণেও বাড়ছে ঝুঁকি:
বরিশালের কীর্তনখোলা নদীসহ বিভিন্ন নদী, খাল ও জলাশয় বর্জ্য ও দখলের কারণে দূষণের শিকার হচ্ছে। এসব জলাশয় পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। পানির উৎস দূষিত হলে নিরাপদ পানি সরবরাহের ওপরও চাপ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে হলে নদী-খাল রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বাস্তবায়ন নিয়ে নজরদারি জরুরি:
বরিশালের ১০ উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকায় পানি ও স্যানিটেশন সমস্যার ধরন এক নয়। কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, কোথাও লবণাক্ততা, কোথাও জলাবদ্ধতা ও বন্যা, আবার কোথাও অবকাঠামোর ঘাটতি প্রধান সমস্যা।
তাই কোন এলাকায় পানির সংকট বেশি, কোথায় গভীর নলকূপ প্রয়োজন এবং কোন পরিবার প্রকৃত অর্থে স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত—এসব বিষয় যাচাই করে প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বরিশাল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমরান তরফদার বলেন, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় বরিশাল জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে প্রয়োজন অনুযায়ী গভীর নলকূপ স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ স্যানিটেশন প্রকল্পের মাধ্যমে হতদরিদ্র পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণ করা হবে। তিনি বলেন, “নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। প্রকল্পের মাধ্যমে যেসব এলাকায় পানির সংকট রয়েছে এবং যেসব দরিদ্র পরিবার এখনো স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধার বাইরে রয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।”
বরিশাল জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আযাদ আলাউদ্দীন মানবকণ্ঠকে বলেন, বরিশালের প্রত্যন্ত জনপদে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নলকূপ ও টয়লেট নির্মাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, পানির মান পরীক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সুফল ধরে রাখা কঠিন হবে।









































