বরিশালে ডায়রিয়ার প্রকোপ, এক মাসে রোগী বেড়েছে ৩২ শতাংশ
অক্টোবর ১১ ২০২৬, ২২:১৩
ফাহিম ফিরোজ : বরিশালে গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা নিতে ছুটছেন বরিশাল জেনারেল (সদর) হাসপাতালে। কিন্তু রোগীর তুলনায় শয্যা অপ্রতুল হওয়ায় সেখানে বাড়ছে দুর্ভোগ। ১৪ শয্যার ডায়রিয়া ওয়ার্ডে একসঙ্গে ভর্তি রয়েছেন ২৬ জন রোগী। শয্যা না পেয়ে কাউকে থাকতে হচ্ছে মেঝেতে, কেউ বসে আছেন বেঞ্চে, আবার কারও ঠাঁই হয়েছে বারান্দায়। গরমের মধ্যে এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক রোগীদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্বজনদের।
রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর চাপে ওয়ার্ডের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত শয্যায় রোগী থাকার পরও অতিরিক্ত রোগীদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কোথাও মেঝেতে রোগীর অবস্থান, কোথাও বেঞ্চে বসে চলছে চিকিৎসা। বারান্দায়ও দেখা গেছে স্যালাইন হাতে রোগীদের অপেক্ষা করতে। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় অসুস্থ অবস্থায়ও স্বস্তিতে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন না অনেক রোগী।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আগে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শয্যা ছিল মাত্র ১০টি। রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় পরে আরও চারটি শয্যা বাড়িয়ে মোট ১৪টি করা হয়। তবে শয্যা বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন রোগী এ ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসছেন। ফলে নির্ধারিত শয্যার বাইরে থাকা রোগীদের ভোগান্তি থেকেই যাচ্ছে।
এক দিন অপেক্ষার পরও মিলছে না শয্যা:
তিন দিন ধরে অসুস্থ থাকার পর শনিবার হাসপাতালে ভর্তি হয় শিশু সম্রাট। হাসপাতালে আসার এক দিন পর শয্যা পেয়েছে সে। সম্রাটের মা জানান, রোগীর প্রচণ্ড চাপের কারণে গরমের মধ্যে তাঁর সন্তান আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অসুস্থ শিশুকে নিয়ে এমন পরিবেশে থাকতে গিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন বাকেরগঞ্জের কালাম। শনিবার হাসপাতালে ভর্তি হলেও তিনি শয্যা পাননি। অন্যদিকে নগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দিনমজুর হিরন রোববার সকালে হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি জানান, প্রচণ্ড গরমে কাজ করতে গিয়ে শনিবার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় রোববার সকালে হাসপাতালে আসেন।
রোগী ও স্বজনদের কয়েকজনের অভিযোগ, কিছুটা সুস্থ বোধ করলেই হাসপাতাল ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে রোগীর চাপ ও শয্যা সংকটের কারণে চিকিৎসা নেওয়ার পুরো সময়টিতেই নানা অসুবিধার মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।
এক মাসে রোগী বেড়েছে ৩২ শতাংশ:
হাসপাতালের পরিসংখ্যানেও ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। গত সেপ্টেম্বর মাসে বরিশাল সদর হাসপাতালে ডায়রিয়ার চিকিৎসা নিয়েছেন ৮৮৪ জন। এর আগের মাস আগস্টে এ সংখ্যা ছিল ৬৭১। অর্থাৎ এক মাসে রোগী বেড়েছে ২১৩ জন, যা প্রায় ৩২ শতাংশ।
এ ছাড়া হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ২৮ জন, শনিবার ৩৩ জন এবং রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৬ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে এত রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে সীমিত শয্যার ওয়ার্ডটিতে সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
ডায়রিয়া ওয়ার্ডের ইনচার্জ টুম্পা রাণী বলেন, “প্রতিদিন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের এখানে শুধু শয্যা সংকট ছাড়া অন্য সবকিছু পর্যাপ্ত রয়েছে।”
নতুন ভবনে ওয়ার্ড স্থানান্তরের অপেক্ষা:
বরিশাল জেনারেল (সদর) হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল বলেন, “গরম বেশি পড়েছে, যে কারণে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা একটু বেশি। আমাদের এখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার স্যালাইন ও ওষুধ মজুদ রয়েছে। ডায়রিয়া ওয়ার্ডের জন্য নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে। আশা করি, শিগগিরই নতুন ভবনে ডায়রিয়া ওয়ার্ড স্থানান্তর করা হলে শয্যা সংকট দূর হবে।”
ডায়রিয়া থেকে বাঁচতে যা করবেন:
ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল ডায়রিয়া প্রতিরোধে নিরাপদ পানি পান, খাবারের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর পরামর্শ, গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হতে পারে। তাই বাসি, খোলা ও দূষিত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। খাবার তৈরির আগে ও খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ডায়রিয়া শুরু হলে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই দ্রুত খাবার স্যালাইন খাওয়ানো জরুরি। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।








































