শেবামেক অফিস সহায়ক সবুর খানের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

জুন ২৩ ২০২৬, ০০:৫২

স্টাফ রিপোর্টার : বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের (শেবামেক) অফিস সহায়ক (নৈশ প্রহরী) মো. আব্দুল সবুর খানের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরিতে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রবেশ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক চাঁদাবাজি, পেনশন বাণিজ্য, কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিনষ্টের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ এনে কলেজ প্রশাসনের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী কর্মচারীরা। অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আসার পর কলেজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে সবুর খানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি।

চাকরিতে প্রবেশেই জালিয়াতির অভিযোগ: লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. আব্দুল সবুর খান ২০০৬ সালের ১৪ নভেম্বর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। চাকরিতে প্রবেশের সময় তিনি মিথ্যা তথ্য ও ভুয়া জন্মতারিখ ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার সনদপত্র নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে অতীতে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি।

রাজনৈতিক পরিচয় বদলে ক্ষমতা ধরে রাখার অভিযোগ: অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সবুর খান তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা আদায় করেন এবং সাধারণ কর্মচারীদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে বিএনপির সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেওয়া শুরু করেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তোলা ছবি ব্যবহার করে কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখান। নিজেকে কর্মচারী সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা দাবি করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অধ্যক্ষকে সংবর্ধনার নামে দুই লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: সম্প্রতি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. আনোয়ার হোসেন বাবলুর দায়িত্ব গ্রহণ উপলক্ষে ফুল ও মিষ্টি বিতরণের নামে বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে সবুর খানের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২০০ টাকা এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের কাছ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এভাবে প্রায় দুই লাখ টাকা সংগ্রহ করা হলেও তার কোনো হিসাব কর্মচারীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি।

মৃত্যুবার্ষিকী, পে-স্কেল ও ঢাকা সফরের নামে চাঁদাবাজি: লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, কর্মচারী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আব্দুল আজিজের মৃত্যুবার্ষিকী, বিভিন্ন দোয়া অনুষ্ঠান, পে-স্কেল আন্দোলন এবং ঢাকা সফরের নামে দীর্ঘদিন ধরে কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে।অভিযোগকারীরা দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রে কর্মচারীরা কোনো কর্মসূচিতে অংশ না নিলেও তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা হয়েছে। জনপ্রতি ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে কয়েক দফায় বিপুল অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।

আউটসোর্সিং কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ীকরণের নামে অর্থ আদায়: অভিযোগে বলা হয়েছে, আউটসোর্সিং কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী করে দেওয়া এবং বকেয়া বেতন উত্তোলনের আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া যাদের চাকরি এখনও স্থায়ী হয়নি, তাদের স্থায়ীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা হবে বলে ভয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

পেনশন বাণিজ্যের অভিযোগ: সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো পেনশন সংক্রান্ত অনিয়ম। অভিযোগ অনুযায়ী, মৃত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পেনশনের টাকা পাইয়ে দেওয়ার নামে এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ দাবি করা হয়। কলেজের প্রয়াত ঝাড়ুদার সেলিম হাওলাদারের পরিবারের পেনশন সংক্রান্ত নথি নিজের জিম্মায় নেওয়া এবং সম্প্রতি মারা যাওয়া টেকনোলজিস্ট এনামুল হকের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এজি অফিসে আত্মীয়স্বজন থাকার কথা বলে তিনি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন।

ডিউটি ফাঁকি ও নারী কর্মচারীকে হয়রানির অভিযোগ: অভিযোগে বলা হয়েছে, ছাত্রী হোস্টেলের নৈশপ্রহরী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও সবুর খান নিয়মিতভাবে রাতের ডিউটি পালন করেন না। তিনি নির্ধারিত সময়ে এসে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে চলে যান এবং পরদিন সকালে আবার উপস্থিত হয়ে দায়িত্ব পালনের দেখানো হয়। এছাড়া এক নারী কর্মচারীকে কু-প্রস্তাব দেওয়া এবং গভীর রাতে ফোন করে বিরক্ত করার অভিযোগও করা হয়েছে।

চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ: লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্যাশ পিয়ন হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সোনালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তার সঙ্গে অসদাচরণ করেন। এছাড়া বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসকদের সঙ্গেও উগ্র আচরণ, টেবিলে আঘাত করা এবং উচ্চস্বরে কথা বলার অভিযোগ রয়েছে।

অধ্যক্ষের পিএকে গালিগালাজের অভিযোগ: গত ১৮ জুন অধ্যক্ষের ব্যক্তিগত সহকারী মো. তৌহিদুল ইসলাম পৃথক এক লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, সবুর খান অধ্যক্ষের কার্যালয়ে উচ্চস্বরে অশালীন মন্তব্য করেন। তাকে শান্ত থাকতে বলা হলে তিনি উত্তেজিত হয়ে গালিগালাজ করেন এবং আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। এ ঘটনায় তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন রহস্য: অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে সবুর খানের বিরুদ্ধে ভুয়া জন্মতারিখ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে অজ্ঞাত কারণে সেই কমিটির প্রতিবেদন আজও প্রকাশ হয়নি। তবে আ: সবুর খানকে বদলির সুপারিশ করে মন্ত্রনালয়কে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলো কলেজ কর্তৃপক্ষ। এরপরেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কর্মচারীদের মধ্যে ভয় আতঙ্ক: ভুক্তভোগী কয়েকজন কর্মচারী অভিযোগ করেন, সবুর খানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বললে চাকরি, সার্ভিস বুক, পদোন্নতি কিংবা পেনশন সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি করা হবে বলে ভয় দেখানো হয়। ফলে অনেকে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে সাহস পাচ্ছেন না।

অভিযোগের বিষয়ে মো. আব্দুল সবুর খানকে ফোন করা হলে তিনি কোন বক্তব্য দিবেন না। সাংবাদিককে কলেজের অধ্যক্ষের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে বলেন। এ বিষয়ে শেবাচিমের অধ্যক্ষ ডা. আনোয়ার হোসেনকে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেন নি।

এদিকে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন কলেজের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।