শিকলে বাঁধা মেয়ে, অসুস্থ বোনের চিকিৎসার ভারে অসহায় ষাটোর্ধ্ব আছিয়া, পাশে নেই কেউ
আগস্ট ২২ ২০২৬, ২২:৪৯
মহিপুর প্রতিনিধি : মেয়ে ও বোন—দুজনই মানসিকভাবে অসুস্থ। একজনকে মানুষের ক্ষতি করার আশঙ্কায় শিকলে বেঁধে রাখতে হয়, অন্যজন দীর্ঘদিন ধরে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপনও করতে পারেন না। আর এই দুজনকে আগলে রেখেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন ষাটোর্ধ্ব আছিয়া বেগম।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের জরাজীর্ণ একটি ঘরে বসবাস আছিয়া বেগম, তাঁর মানসিকভাবে অসুস্থ মেয়ে ও বোনের। নিজের শরীরও ভালো নেই। কোমরে তীব্র ব্যথা, বয়সের ভারে কাজ করার সক্ষমতা হারিয়েছেন। তবু থেমে নেই তাঁর সংগ্রাম। মেয়ে ও বোনের চিকিৎসা, খাবার ও দৈনন্দিন দেখভালের পাশাপাশি নিজের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।
আছিয়ার মেয়ে আসমা বেগম ডলি (৩৬) প্রায় ১০ বছর ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। অসুস্থতার শুরুর দিকে স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। এরপর সময়ের সঙ্গে তাঁর অসুস্থতা আরও বেড়ে যায়। আছিয়ার ভাষ্য, অসুস্থতার কারণে কখনো কখনো ডলি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না এবং মানুষের ক্ষতি করার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণে বাধ্য হয়ে মেয়েকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয় তাঁকে।
অন্যদিকে আছিয়ার বোন ফাতেমা বেগম (৫৫) প্রায় ৩০ বছর ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজও ঠিকমতো করতে পারেন না তিনি। মল-মূত্র ত্যাগের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় তাঁকে জরাজীর্ণ একটি ঘরে আলাদা করে রাখতে হয়। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও চিকিৎসার অভাবে তাঁর অবস্থাও দিন দিন শোচনীয় হয়ে উঠেছে।
দুজন অসুস্থ স্বজনের দায়িত্ব একা কাঁধে তুলে নেওয়া আছিয়ার নিজের জীবনটাও যেন থমকে গেছে। প্রায় ৪০ বছর আগে স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। এরপর আর নতুন করে সংসার করেননি। মেয়ে ও বোনকে নিয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের দীর্ঘ সময়।
একসময় মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ভিক্ষা করে সংসার চালাতেন আছিয়া। কিন্তু বয়স বেড়েছে, শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা অসুস্থতা। কোমরের ব্যথায় এখন আগের মতো হাঁটাচলা বা কাজ করাও সম্ভব হয় না। ফলে ভিক্ষা করেও সংসার চালানোর সেই সামান্য সুযোগটুকুও হারিয়েছেন তিনি।
প্রায় ছয় বছর আগে সরকার থেকে একটি ঘর পেয়েছিলেন আছিয়া। আশ্রয় পেলেও সময়ের সঙ্গে সেই ঘরটিও এখন নড়বড়ে ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি পড়ার আশঙ্কা থাকে। অসুস্থ দুই নারীকে নিয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে বসবাস করতে হচ্ছে তাঁকে।
স্থানীয় বাসিন্দা হাসান পারভেজ বলেন, ‘আমাদের এলাকার সবচেয়ে অসহায় পরিবার এটি। ছয় বছর আগে সরকার পরিবারটিকে একটি ঘর দিয়েছিল। কিন্তু ঘরটিও এখন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এটি সংস্কার করা খুবই প্রয়োজন।’
একই গ্রামের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এ পরিবারে কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই। সরকার থেকে তারা যে ভাতা পান, তা দিয়ে খুব কষ্টে সংসার চলছে। তিনজনেরই চিকিৎসা প্রয়োজন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।’
আছিয়া বেগম বলেন, ‘আমার কোমরে অনেক ব্যথা। কাজ করতে পারি না। তারপরও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত আমার মেয়ে ও বোনকে দেখাশোনা করতে হয়। আমরা তিনজনই সরকার থেকে কিছু টাকা পাই। কিন্তু তা দিয়ে ওষুধ তো দূরের কথা, আমাদের তিনজনের জীবন চালানোই কঠিন।’
কথাগুলো বলতে বলতে আছিয়ার কণ্ঠে ফুটে ওঠে অসহায়ত্ব। নিজের জন্য নয়, তাঁর আকুতি মূলত অসুস্থ মেয়ে ও বোনকে ঘিরেই।
তিনি বলেন, ‘আমি যতদিন বেঁচে আছি, মেয়ে আর বোনকে দেখাশোনা করতে চাই। কিন্তু এখন আমি নিজেই অসুস্থ। তাদের চিকিৎসা করানো, খাবার জোগানো এবং ঘরটি ঠিক করা—সবকিছুই আমার একার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।’
সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষদের সহযোগিতা কামনা করে আছিয়া বেগম বলেন, ‘আমাকে সাহায্য করতে চাইলে দয়া করে ০১৬১৭৩৯২৬০৮ নম্বরে যোগাযোগ করবেন।’
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘অসহায় এ পরিবারটির খোঁজখবর নিয়ে তাদের সরকারি সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।’
একটি পরিবারে যখন উপার্জনক্ষম কেউ থাকে না, তখন সামান্য অসুস্থতাও সেখানে বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায়। আছিয়া বেগমের পরিবার যেন তারই নির্মম উদাহরণ। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া একজন নারী আজও নিজের অসুস্থতা ভুলে মেয়ে ও বোনের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাঁর এই দীর্ঘ সংগ্রামে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের মানবিক সহযোগিতাই পারে পরিবারটির জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে।










































