বিস্মৃতির অন্তরালে শঙ্খ ঘোষ: এক ঋষিকল্প কবির শেকড় ও বৈশ্বিক দর্পণের ব্যবচ্ছেদ
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ ::
📌 বরিশালের বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদীর তীরে দাঁড়ালে আজও হয়তো বাতাসে এক শান্ত, ধীরস্থির মিতভাষী মানুষের ঘ্রাণ পাওয়া যায়, যেখানে জলের কলতান আর হিজল-তালের ছায়া মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। কিন্তু এক নিদারুণ ঐতিহাসিক ও নান্দনিক পরিহাসের বিষয় হলো, যে মাটির সোঁদা গন্ধে বড় হয়ে ওঠা এক বালক পরবর্তীতে আধুনিক বাংলা কবিতার ‘শঙ্খ’ বাজিয়ে বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় বাঙালি মননের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন, তাঁর সেই পৈত্রিক ভিটেমাটি আজ চরম অযত্ন আর বিস্মৃতির অতলে নিমজ্জিত। কবি শঙ্খ ঘোষ—যিনি জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলা কবিতার প্রধান বিবেক এবং আধুনিক সাহিত্যের নৈতিক ধ্রুবতারা হিসেবে স্বীকৃত—তাঁর স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িটি আজ আগাছায় ঢাকা এক জীর্ণ কঙ্কাল। সেখানে কোনো স্মৃতিফলক নেই, নেই কবির নামাঙ্কিত কোনো চিহ্ন; বরং সেখানে ঝুলে আছে ‘বাড়ি ভাড়া দেওয়া হইবে’ সম্বলিত এক বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন। এটি কেবল একটি স্থাপনার অবক্ষয় নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব, রুচির ভাঙন এবং এক গভীরতর স্মৃতিহনন বা ‘কালচারাল অ্যামনেসিয়া’র করুণ আখ্যান। মিলান কুন্ডেরা লিখেছিলেন, বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রামই হলো ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম। শঙ্খ ঘোষের পৈত্রিক ভিটায় ভাড়ার বিজ্ঞাপনটি আসলে সেই বিস্মৃতিরই এক নগ্ন আস্ফালন।
১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া চিত্তপ্রিয় ঘোষ—সাহিত্যজগতে যিনি শঙ্খ ঘোষ নামে সমাদৃত—তাঁর চেতনার সূতিকাগার ছিল বানারীপাড়ার এই আদি নিবাস। মনীন্দ্রকুমার ও অমলবালা ঘোষের এই নিভৃত আঙিনাটি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের প্রগতিশীল জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। কবির আত্মজীবনীমূলক গদ্য ‘প্রহর জোড়া তালি’ এবং ‘বটতলা’র পাতা উল্টালে দেখা যায়, বরিশালের সেই নদী-মেঠোপথ আর বর্ষার জলছবির মধ্যেই রোপিত ছিল তাঁর পরবর্তী জীবনের সেই নির্মেদ ও গভীর শব্দবিন্যাসের বীজ। মনস্তাত্ত্বিক স্থানাঙ্ক বা ‘সাইকোজোগ্রাফি’র নিরিখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সন্ধ্যা নদীর চরের সেই নিস্তব্ধতা এবং দিগন্তজোড়া নির্জনতাই কবির কবিতার ‘মিনিমালিজম’ বা মিতভাষী শৈলী নির্মাণ করেছে। তাঁর এই নীরবতার নান্দনিকতা তাঁকে জাপানি ‘জেন’ দর্শন কিংবা স্যামুয়েল বেকেটের মিতকথনের সমান্তরালে দাঁড় করিয়েছে। জীবনানন্দ দাশ যেখানে নিসর্গের মাঝে ‘বিপন্ন বিস্ময়’ খুঁজেছিলেন, শঙ্খ ঘোষ সেখানে জীবনানন্দের সেই উত্তরাধিকারকে রূপান্তর করেছিলেন এক তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদে।
শঙ্খ ঘোষের সমসাময়িকের প্রেক্ষাপট ছিল দেশভাগ, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ এবং উত্তাল রাজনৈতিক পালাবদলের এক সংক্ষুব্ধ সময়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দিনগুলি রাতগুলি’ (১৯৫৬)-তে যে নাগরিক বিষণ্ণতা ছিল, তা সত্তরের দশকে নকশাল আন্দোলন এবং পরবর্তীতে জরুরি অবস্থার শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে এসে এক অমোঘ নৈতিক প্রতিবাদের রূপ নেয়। ‘বাবরের প্রার্থনা’ (১৯৭৪) কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে উচ্চকণ্ঠ না হয়েও কবিতার গূঢ় ব্যঞ্জনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারকে কাঁপিয়ে দেওয়া সম্ভব। বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে দাঁড়ালে তাঁকে পাবলো নেরুদা কিংবা বার্টোল্ট ব্রেখটের সমান্তরালে স্থাপন করা যায়। নেরুদা যেমন স্পেনের গৃহযুদ্ধের ক্ষতকে কবিতায় ধারণ করেছিলেন, শঙ্খ ঘোষ তেমনি সমকালের অস্থিরতাকে ধারণ করেছেন। বার্টোল্ট ব্রেখট একদা লিখেছিলেন— অন্ধকার সময়েও কি গান গাওয়া হবে? হ্যাঁ, গাওয়া হবে সেই অন্ধকারেরই গান। ব্রেখটের এই দর্শনের মতোই শঙ্খ ঘোষের কবিতা সংকটের দিনে আমাদের পথ দেখিয়েছে। যখনই রাষ্ট্র বা সমাজ কোনো দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, তাঁর কলম তখন সাহসের সাথে সেই সংকটের কথাই তুলে ধরেছে।
বর্তমান সময়ে শঙ্খ ঘোষের প্রাসঙ্গিকতা যেন আগের চেয়েও অনেক বেশি অনিবার্য। আমরা এমন এক সময় পার করছি যখন চারদিকে শব্দের আস্ফালন আর কৃত্রিম আধুনিকতার ভিড়ে প্রকৃত সত্য হারিয়ে যাচ্ছে। আজকের এই সত্য-উত্তর যুগে শঙ্খ ঘোষ আমাদের বিবেককে ক্রমাগত কড়া নাড়েন। তাঁর ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ কাব্যগ্রন্থের সেই অমোঘ পঙক্তিটি ফরাসি তাত্ত্বিক গাই ডিবোর্ডের ‘সোসাইটি অফ দ্য স্পেকটাকল’ তত্ত্বের এক কাব্যিক প্রতিচ্ছবি; যেখানে মানুষের মনুষ্যত্ব পণ্যের মোড়কে ঢাকা পড়ে যায়। আজ যখন কবির সেই জন্মভিটার গেটে ভাড়ার বিজ্ঞাপন ঝোলে, তখন এটি কবির দর্শনেরই এক নিষ্ঠুর ও উপহাসমূলক বাস্তবতা হিসেবে ধরা দেয়। যখন তিনি ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’ কাব্যে লেখেন— “আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি”, তখন সেটি কেবল একটি সামাজিক আহ্বান থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে আজকের অসহিষ্ণু ও বিচ্ছিন্ন সমাজের বিরুদ্ধে এক মানবিক ইশতেহার।
বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত সাহিত্যিকদের স্মৃতি চিরস্থায়ী করে রাখার অনেক উদাহরণ রয়েছে— যেমন ইংল্যান্ডে শেক্সপিয়রের বাড়ি, রাশিয়ায় আনা আখমাতোভার মিউজিয়াম কিংবা প্রাগে ফ্রাঞ্জ কাফকার স্মৃতিস্তম্ভ। সারা বিশ্ব এই স্থানগুলোকে পরম শ্রদ্ধায় সংরক্ষণ করে। কিন্তু আমাদের দেশে শঙ্খ ঘোষের মতো একজন মহান কবির পৈতৃক ভিটার এই করুণ দশা প্রমাণ করে যে, আমরা নিজেদের সাংস্কৃতিক সম্পদকে মর্যাদা দিতে কতটা ব্যর্থ। কবির দর্শনে ‘মৌনতা’ ছিল এক শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার। তিনি যখন ‘দিনগুলি রাতগুলি’ কাব্যে বলেন— “হাতে হাত রাখা মানেই তো সত্যের পাশে দাঁড়ানো নয়”, তখন তিনি আমাদের চিরাচরিত সামাজিক ভণ্ডামিকে আঘাত করেন। তাঁর এই নৈতিক দৃঢ়তা ফরাসি দার্শনিক মরিস ব্লঁশোঁর সেই অমোঘ লেখনীর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে বিপর্যয়ই হয়ে ওঠে সৃষ্টির ভাষা। বিশেষ করে রবীন্দ্র-চর্চায় তাঁর যে প্রজ্ঞা—যা প্রতিফলিত হয়েছে ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ বা ‘এ আমির আবরণ’ গ্রন্থে—তা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
বিস্ময়কর হলো, তাঁর ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যে যখন তিনি বলেন— “ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও / আমার সন্ততি স্বপ্ন দেখুক”, তখন তিনি যে আগামীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই উত্তরসূরিরা আজ তাঁর গৃহের পরিচয়টুকু মুছে দিচ্ছে। অবিলম্বে কবির পৈত্রিক ভিটাটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নিয়ে সংস্কার করে সেখানে একটি শঙ্খ ঘোষ আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র, ডিজিটাল আর্কাইভ ও লিটারারি মিউজিয়াম স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। শঙ্খ ঘোষ শিখিয়েছিলেন কীভাবে মাথা উঁচু করে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। আজ সময় এসেছে সেই শব্দহীন প্রতিবাদের উত্তরসূরি হওয়ার। যে কবির শব্দে আমরা সংকটের দিনে ভাষা খুঁজি, যাঁর মৌনতা আমাদের আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মাঝখানে এক সেতুবন্ধন তৈরি করে, তাঁর জন্মস্থানকে এই অপমানে বিদ্ধ রাখা আমাদের জাতীয় কলঙ্ক। এটি কেবল একটি বাড়ি রক্ষা নয়, বরং আমাদের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার যুদ্ধ।
বানারীপাড়ার সেই জীর্ণ দেয়ালগুলো যেন আবার গর্জে ওঠে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে। কবির নামফলকহীন সেই বাড়িটি যেন আবার আমাদের সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে। কারণ একটি জাতি যদি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শৈশবের মাটিকে সংরক্ষণ করতে না পারে, তবে সেই জাতি কোনোদিনই বিশ্বদরবারে মেধার প্রকৃত মর্যাদা পাবে না। শঙ্খ ঘোষের বাড়ির এই জীর্ণতা আসলে আমাদেরই সম্মিলিত অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। কবির সেই নির্জন ও ঋষিকল্প পৈতৃক ভিটাটি যদি আজ সংরক্ষিত না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কেবল ইতিহাসবিস্মৃত নয়, বরং কৃতজ্ঞতাহীন জাতি হিসেবেই অভিযুক্ত করবে।
সময় বহমান, কিন্তু সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা চিরন্তন। বানারীপাড়ার সেই লোনা ধরা দেয়ালগুলো আজ সংস্কার নয়, আমাদের চেতনার পুনর্জাগরণ দাবি করছে। কবির সেই কালজয়ী পঙক্তিমালাকে অমরত্ব দিতে হলে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত মাটিকে আগলে রাখা আমাদের নৈতিক দায়। এই উদ্যোগই হতে পারে কবির প্রতি জাতির শ্রেষ্ঠ ঋণস্বীকার। এই নিভৃত শঙ্খধ্বনি যেন আমাদের আত্মিক জাগরণের গান হয়ে ফিরে আসে প্রতিটি চিন্তাশীল বাঙালির হৃদয়ে।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)










































