হিজলায় পানির অভাবে আবাদ হচ্ছে না ৫০০ হেক্টর জমি, ‘জিয়া খাল’ পুনঃখননের দাবি
মোঃ হাবিবুল্লাহ বেপারী, হিজলা : বরিশালের হিজলা উপজেলার কাউরিয়া বন্দর থেকে কালিকাপুর (গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন) পর্যন্ত প্রায় ৯–১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘জিয়া খাল’ একসময় ছিল এ অঞ্চলের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। বর্তমানে পলি জমে, অবৈধ দখল ও অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনায় খালটি প্রায় মৃতপ্রায়। ফলে পানির অভাবে অন্তত ৫০০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। ১৯৮০ সালের ৭ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে হিজলা সফরকালে এই খালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসন ছিল সেই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
পলি ও দখলে সংকুচিত প্রবাহ:
২৬ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে দেখা যায়, কাউরিয়া বন্দর সংলগ্ন সুইস গেটের উভয় পাশে ব্যাপক পলি জমে পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সুইস গেটটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। খালের বিভিন্ন অংশ ভরাট করে অবৈধ দখল ও স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। কোথাও কোথাও খালের প্রস্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, ফলে বর্ষা মৌসুমেও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বজায় থাকে না। খালটি নরসিংহপুর, পশ্চিম কোড়ালিয়া ও চর নরসিংহপুর হয়ে কালিকাপুর সুইস গেট পর্যন্ত বিস্তৃত। পুরো দৈর্ঘ্যের বড় অংশেই পলি জমে থাকায় সেচব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
অচল ৩০টির বেশি সেচ পাম্প:
খালের দুই তীরে স্থাপিত ৩০টির বেশি সেচ পাম্প বর্তমানে প্রায় অচল। ব্লক ম্যানেজার আরিফ হোসেন মৃধা জানান, তাঁর আওতাধীন প্রায় এক হাজার কৃষক পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। একই তথ্য দিয়েছেন ব্লক ম্যানেজার মনিরুজ্জামান মল্লিক ও সোবহান সরদার। কৃষকদের ভাষ্য, খালে পানি না থাকায় বোরো ধান চাষ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ৫০০ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন কমে গেছে বা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অনেকে আবাদ কমিয়ে দিয়েছেন, কেউ কেউ বিকল্প পেশায় ঝুঁকছেন। এতে কৃষি নির্ভর স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
লক্ষ্যমাত্রায় ঘাটতি:
হিজলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আহসানুল হাবীব আল আজাদ জনি জানান, গত অর্থবছরে বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২,২০০ হেক্টর। কিন্তু সময়মতো পানির অভাবে মাত্র ১,৯০০ হেক্টরে আবাদ সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৩০০ হেক্টর ঘাটতি রয়ে গেছে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে খাল খনন ও সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে সব খালের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হলে এ খালটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
প্রশাসনের উদ্যোগ:
হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইলিয়াস শিকদার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে খাল সংস্কারের সম্ভাব্য তালিকা চাওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন তালিকা চূড়ান্ত করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তা প্রেরণ করবে। নির্দেশনা অনুযায়ী খাল খনন ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
কৃষকদের প্রত্যাশা:
চার দশকের বেশি আগে কৃষি বিপ্লবের অংশ হিসেবে উদ্বোধন হওয়া এই খাল দীর্ঘদিন বড় ধরনের সংস্কার না হওয়ায় কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খাল খনন ও সংস্কারের উদ্যোগে স্থানীয় কৃষক পরিবারগুলো আশাবাদী। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সেচ ব্যবস্থা পুনরায় সচল হবে, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে এবং এলাকার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।
হিজলার এই ঐতিহাসিক খাল শুধু একটি জলপথ নয়; এটি হাজারো কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কার্যকর পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়নই পারে ‘জিয়া খাল’-কে আবারও উৎপাদনের ধারায় ফিরিয়ে আনতে।










































