ফলন ভালো, দামে মন্দা: নেছারাবাদে আমড়া চাষিদের মাথায় হাত
অক্টোবর ২৭ ২০২৬, ২২:৫৪
নেছারাবাদ প্রতিনিধি : পিরোজপুরের নেছারাবাদে এ বছর আমড়ার বাম্পার ফলন হলেও অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা আর যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার আমড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভালো ফলনেও আমড়ার উপযুক্ত দাম না মেলায় বরাবরই লাভের মুখ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ব্যবসায়ী ও চাষিরা।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এ অঞ্চলে আমড়ার বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়। আমড়ার ভালো ফলনেও এ পর্যন্ত ব্যক্তিগত বা সরকারের চেষ্টায় কোনো হিমাগার গড়ে না ওঠায় মৌসুমে চিন্তিত থাকেন দুই সহস্রাধিক আমড়া চাষি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতরা।
এলাকাবাসী জানায়, নেছারাবাদের আমড়া দেশব্যাপী ‘বরিশালের আমড়া’ নামে পরিচিত। আমড়া চাষ এ অঞ্চলের মানুষের অনেক পুরনো পেশা। উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামের বাড়ির সামনে একটি দুইটি আমড়া গাছ রয়েছে। আশির দশকের মাজামাঝি সময় আটঘর কুড়িয়ানাতে বাণিজ্যিকভাবে আমড়া চাষ শুরু হয়।
পরে উপজেলা জলাবাড়ী, বলদিয়া, দৈহারী ও সমুদয়কাঠী ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে শুরু হয় আমড়া চাষ। বাংলা ভাদ্র আশ্বিন ও কার্তিক এই তিন মাস আমড়ার ভরা মৌসুম। প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকাগামী লঞ্চ, ট্রাকে করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মোকামে এই বরিশালের আমড়া বিক্রির উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়।
চাষিরা আমড়া পেড়ে নৌকায় ভরে ব্যবসায়ীদের কাছে নিয়ে আসেন। আবার কোনো চাষি আগাম আমড়া ক্ষেত বিক্রি করেন ব্যবসায়ীদের কাছে। ব্যবসায়ীরা আমড়া কিনে ক্যারেট ও বস্তায় ভরে নৌ ও স্থলপথে পাঠান দূর-দূরান্তে। সেখান থেকে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা আমড়া কিনে ছড়িয়ে দেন সারা দেশে।
স্থানীয় আমড়া ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের একই সময়ে প্রতি মণ আমড়া বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ২৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। অথচ চলতি মৌসুমে সেই আমড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ, প্রতি মণে দাম কমেছে প্রায় ৮৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা। একদিকে ফলের দাম কম, অন্যদিকে অতিরিক্ত পেকে ঝরে পড়ায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. ফিরোজ বলেন, ‘এ বছর আমড়ার বাজার খুবই খারাপ। আমড়া অতিরিক্ত পেকে যাওয়ায় অনেক ফল ঝরে পড়েছে। এতে আমাদের অর্ধেক পরিমাণ আমড়ার ক্ষতি হয়েছে। গত বছর এ সময়ে যে দামে আমড়া বিক্রি করেছি, এ বছর তার চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে ব্যবসা করে লাভের পরিবর্তে লোকসান হচ্ছে।’
আরেক ব্যবসায়ী সত্যেনন্দ হালদার অভিযোগ করে বলেন, ‘কৃষি অফিস থেকে আমরা তেমন কোনো সহযোগিতা পাই না। তারা যদি আমাদের দিকে একটু নজর দিতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা করতেন, তাহলে আমাদের অনেক উপকার হতো। আমরা আরও বেশি আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারতাম।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমড়ার ব্যবসা করে লাভ তো দূরের কথা, লোকসান গুনতে হচ্ছে।’ নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মাহফুজুর রহমান জানান, চলতি বছর নেছারাবাদ উপজেলায় ৩০০ হেক্টর জমিতে আমড়ার আবাদ হয়েছে। উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে চার হাজার আমড়ার বাগান রয়েছে। এ বছর প্রতি হেক্টরে আমড়ার উৎপাদন ১৬ মেট্রিক টন বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, আমড়াচাষিদের উৎপাদন বাড়ানো ও চাষাবাদের মান উন্নয়নে কৃষি বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে। চাষিদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আমড়া অতিরিক্ত পেকে যাওয়া, ফল ঝরে পড়া এবং বাজারে দাম কমে যাওয়ার মতো সমস্যায় তাদের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আমড়া সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে কার্যকর পরামর্শ, কৃষি বিভাগের সঙ্গে ব্যবসায়ী ও চাষিদের সমন্বয় এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ চান তারা।









































