৪ ঘণ্টার চিকিৎসা পেতে লাগছে ৪ দিন

শেবাচিম হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কমিশন নিয়ে কোন্দল

অক্টোবর ১৮ ২০২৬, ২২:০৩

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) জরুরি বিভাগ, ক্যাজুয়ালটি সার্জারি ও অবজারভেশন ওয়ার্ডে গত ৪ মাস ধরে চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার চিকিৎসার জন্যও রোগীদের দিনের পর দিন ভর্তি থাকতে হচ্ছে ওয়ার্ডে। এতে ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে এবং সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে অন্তর্বিভাগ। অন্যদিকে, ক্যাজুয়ালটি ও অবজারভেশন বিভাগের রোগীদের সেবা না দিয়ে উল্টো নিজেদের ইচ্ছামতো শিডিউল বানিয়ে দায়িত্ব সারছেন কর্মরত চিকিৎসকরা। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত সাধারণ রোগী চরম ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ক্যাজুয়ালটি সার্জারি ও অবজারভেশন বিভাগে আগে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী জরুরি চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু বর্তমানে অদৃশ্য কারণে এই দুই বিভাগ প্রায় রোগীশূন্য হয়ে পড়েছে। কোনো দিন ১-২ জন রোগী ভর্তি হলেও কোনো দিন একজনও থাকে না। বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন মাত্র ৫-৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকেন। হাসপাতালের রেকর্ড অনুযায়ী, ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে গত সেপ্টেম্বর মাসে মোট রোগী ভর্তি হয়েছেন ৮ জন এবং চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ১৫ দিনে ভর্তি হয়েছেন ১২ জন।

একইভাবে অবজারভেশন ওয়ার্ডে সেপ্টেম্বর মাসে রোগী ভর্তি ছিলেন ১৪৪ জন, আর অক্টোবরের ১৫ দিনে সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১ জনে। অথচ এসব বিভাগে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় দেড় হাজার রোগী সেবা পেতেন, যা এখন দেড় শতে এসে ঠেকেছে। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল থাকা সত্ত্বেও তারা সেবা দিচ্ছেন না। আগে চিকিৎসকরা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমানে চিকিৎসকরা সকাল ৯টায় এসে দুপুর ১২টায় চলে যাচ্ছেন, কিংবা দুপুর ১২টায় এসে ৩টায় চলে যাচ্ছেন। ক্যাজুয়ালটি ও অবজারভেশন বিভাগের চিকিৎসকরা ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারদের (ইএমও) সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চুক্তি করে একটি বিকল্প ডিউটি রোস্টার বানিয়ে নিয়েছেন।

ফলে তিন ঘণ্টা ইএমও এবং তিন ঘণ্টা ক্যাজুয়ালটি চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করে দায়িত্ব শেষ করছেন। বর্তমানে ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের ১০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন—ডা. শাহাদাত ও ডা. নাজমুল; বাকি ৮টি পদই শূন্য। পরিচালক মহোদয় ইনডোর থেকে চিকিৎসক যুক্ত করলেও এফসিপিএস ট্রেইনিংয়ের ৫ জন চিকিৎসক ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ইএমও-দের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারছেন না বলে জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্যাজুয়ালটি ও অবজারভেশন ওয়ার্ড দুটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ মিড-লেভেল চিকিৎসকদের মধ্যে ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি-কেন্দ্রিক কমিশন বাণিজ্য এবং হাসপাতালের ভেতরের চরম কোন্দল।

সড়ক দুর্ঘটনা ও মারামারির ঘটনায় আহত রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে সিটি স্ক্যানসহ প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করানো হতো। পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে জটিলতা না থাকলে ৩-৪ ঘণ্টা পর তাদের ছুটি দেওয়া হতো এবং জটিলদের ইনডোরে পাঠানো হতো। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার কমিশন বাণিজ্য এককভাবে ক্যাজুয়ালটি ও অবজারভেশন বিভাগের চিকিৎসকরা ভোগ করায় ইনডোর বিভাগের সহকারী রেজিস্টারসহ একাধিক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ক্ষুব্ধ হন। তারা জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন যাতে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করিয়ে রোগীদের সরাসরি ইনডোর ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এমনকি মারামারির রোগীদের ক্যাজুয়ালটিতে ভর্তি না করার হুমকিও দেওয়া হয়। এই কোন্দল চরম আকার ধারণ করায় একপর্যায়ে মিড-লেভেল চিকিৎসকরা উক্ত বিভাগে আসা বন্ধ করে দেন। ফলে বকশিস না পাওয়ায় সেখানে ডিউটি করতে অনীহা প্রকাশ করছেন ওয়ার্ড বয় ও স্টাফরাও। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে রেফার করা রোগীরা জরুরি বিভাগে এসে কয়েক ঘণ্টার চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা না পেয়ে ৪-৫ দিন হাসপাতালে পড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। পটুয়াখালী থেকে আসা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রাশেদুল ইসলাম বলেন, “বরিশালে আসার পর পরীক্ষা করে দেখা গেল বড় কোনো জটিলতা নেই।

কিন্তু জরুরি বিভাগে কাজ না হওয়ায় ছোট এই সমস্যার পরও আমাকে ৩ দিন হাসপাতালে পড়ে থাকতে হয়েছে। এতে পানি মতো টাকা খরচ হয়েছে। বাবুগঞ্জ থেকে আসা কুলসুম বেগম জানান, এর আগে একই সমস্যা নিয়ে এসে অবজারভেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে বিকেলেই ছাড়পত্র পেয়েছিলাম। কিন্তু এবার মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হতে হয়েছে এবং চার দিন থাকতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, চিকিৎসা নিতে এসে গলার চেইন, মোবাইল ও টাকা হারিয়েছি। নিরাপত্তা কর্মী থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় আমরা ক্ষতির শিকার হয়েছি।

হাসপাতাল প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মনির, সহকারী পরিচালক এ কে এম মাহমুদুল হাসান এবং অর্থোপেডিক আউটডোর বিভাগের আরএস ডা. মাজহারুল রেজওয়ান রেজা আন্তরিকতার সাথে বিভাগ দুটি সচল রাখার চেষ্টা করছেন। হাসপাতাল পরিচালকের ব্যক্তিগত উদ্যোগে একাধিকবার রোস্টার করে দেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তা মানছেন না।

ক্যাজুয়ালটি ও মেডিসিন অবজারভেশনের নার্স ইনচার্জ মেহেদী হাসান কল্লোল জানান, বর্তমানে অবজারভেশন ওয়ার্ডে দৈনিক গড়ে মাত্র ৪-৫ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, যা আগের তুলনায় অত্যন্ত কম। শেবাচিমের মিডিয়া মুখপাত্র ডা. মাজহারুল রেজওয়ান রেজা জানান, ইএমও পদে ১০টির বিপরীতে মাত্র দুজন থাকায় সেবা কিছুটা ধীরগতির হয়েছে। জনবল সংকটের বিষয়টি পরিচালনা কমিটির সভাপতি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন ও প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার স্যারকে জানানো হয়েছে। লোকবলের অভাব সত্ত্বেও সেবা কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে।

ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, স্থায়ী ডাক্তারের অনুপস্থিতি এবং প্রতি মাসে রোটেশনাল ডিউটি পরিবর্তনের কারণে চিকিৎসকদের মানিয়ে নিতে সময় লাগে। এছাড়া জরুরি বিভাগ থেকেই অনেককে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বিদায় দেওয়া হচ্ছে বলে ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীর সংখ্যা কমেছে।সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. নাজমুল আহাসান বলেন, হাসপাতালের সেবা সচল রাখতে আমরা বারবার সমস্যা দূর করার চেষ্টা করছি। দ্রুতই এর স্থায়ী সমাধান করা হবে।