শ্রী শ্রী শারদীয় দুর্গাপূজা
আলোর মালায় সেজেছে রূপসী বরিশাল
অক্টোবর ১৮ ২০২৬, ১৯:২৪
কমল সেনগুপ্ত : আগামীকাল মহা অষ্টমী। নানা আয়োজনে বরিশালে শুরু হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এবারে বরিশাল মহানগরীতে ৪৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সার্বজনীন ৪২ টি, ব্যাক্তিগত ৬ টি দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্যান্ডেলের সাজসজ্জা, ঢাক-ঢোলের বোল আর রঙিন আলোর ঝলকানিতে পুরো নগরীতে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। জেলায় পূজার সংখ্যা ৫৯০।
মন্ডপে মন্ডপে প্রতিমা শিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরী হয়েছে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, মহিষাসুর এবং পেঁচা, সিংহ। আলোকসজ্জা, থিমভিত্তিক সাজসজ্যা ও গেট বা প্যান্ডেল, রাতে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। ১৬ অক্টোবর শুক্রবার ষষ্ঠী তিথিতে ছিল দেবীর বোধন। শাস্ত্রমতে, শরৎকালে সব দেব-দেবীর মতো দেবীদুর্গাও নিদ্রিত থাকেন। ষষ্ঠীর দিন পুজোর শুরুতেই হয় বোধন।
বাঙালির কাছে দুর্গার বোধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসলে এর সঙ্গে মিশে রয়েছে অনেক রীতি আর বিশ্বাস। ‘বোধন’ কথার মানেই হচ্ছে জাগরণ। দেবীর নিদ্রাভঙ্গের চেষ্টা। ১৭ ও ১৮ অক্টোবর ছিল মহাসপ্তমী। গতকাল গভীর রাত পর্যন্ত মন্দিরে মন্দিরে দর্শনার্থীদের প্রচুর ভীড় লক্ষ্য করা যায়। শহরের দপ্তর খানা, কাউনিয়া সড়ক, সদর রোড, ফলপট্টি, ভাটিখানা, বড় কালীবাড়ী, পাষানময়ী কালিবাড়ি, কাঠপট্টি রোড, শঙ্করমঠ পূজা মন্ডপ পূর্ণ হয় ভক্তদের ভীড়ে। প্রধান প্রধান সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে ট্রাফিক পুলিশ দক্ষ হাতে যানজট সামাল দেয়।
উৎসবে আনন্দে মেতেছে কাউনিয়া জানকিসিংহ রোড আর কাউনিয়া শ্মশান ঘাট সংলগ্ন ভক্ত কলোনীর হরিজনেরা। মেতেছে ঢাকের বাদ্যে, নাচে, গানে, রঙ্গিন আলোর ঝলকানিতে, মহালয়ার সুরে, ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তায়’। পুজো মানেই আকাশে বাতাসে শিউলির সুবাস, প্যান্ডেলের ভিড় আর মন-কেমনের মিষ্টি সুর। মন্ডপে মন্ডপে ফুল, বেলপাতা, আর চন্দনের মায়াবী গন্ধ। এই শারদ উৎসবের সঙ্গে বাঙালির সাথে নাড়ির যোগ হয়েছে হরিজনদেরও। হবে না কেন? এ মাটির সাথে ওদের বন্ধন ১৫০ বছরের। সাত পুরুষ ধরে বসবাস করছে হরিজন সম্প্রদায়।
মহানগরীর আরও ৪৮ টি মন্দিরের মতই হরিজনদের মন্দিরে দর্শনার্থীদের ভীড়। গতকাল সন্ধ্যায় দু মন্ডপে গিয়ে দেখা গেল প্রতিমা ছিমছাম। তবে আলাদা ঢং আছে, আলোকসজ্জা বাহারী আর রকমারি। মন্দিরের সাজসজ্জা এক কথায় সুন্দর। দু জায়গায়ই সাউন্ড বক্সে হিন্দি গান বাজছে। গানের তালে তালে নেচে গেয়ে পরিবেশকে আনন্দময় করে তুলেছে যুবকেরা। তবে যুব সম্প্রদায়ের আয়োজনে স্ব-রোডের শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ নিবাসের পূজা মন্ডপে আধুনিকতার ছোঁয়া আছে। ভাটিখানা পূজা কমিটি তাদের আয়োজনে পুরাতন ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, সদর রোড, শংকর মঠ, ফলপট্টি মন্ডপে আছে যথারীতি বিষয় ভিত্তিক আয়োজন।
বরিশাল জেলার দশটি উপজেলার মধ্যে আগৈলঝাড়ায় সর্বোচ্চ ১৬৯ টি পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়াও উজিরপুর উপজেলায় ১১২ টি, গৌরনদীতে ৭৭ টি বাকেরগঞ্জে ৭৫ টি, বানারীপাড়ায় ৫৬ টি, সদর উপজেলায় ২৬ টি, বাবুগঞ্জে ২৬ টি, মেহেন্দিগঞ্জে ২৩ টি, হিজলায় ১৪ টি, মুলাদী উপজেলায় ১২ টি মন্ডপে দূর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শারদীয় দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ করতে নগরীর প্রতিটি মণ্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
বরিশালের দুর্গা পূজার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ মন্ডপগুলোতে ঘুরতে আসেন, একে অপরকে শুভেচ্ছা জানান। প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় বরিশালে পূজা মন্ডপগুলোতে সবসময় একটি উৎসবমুখর, আনন্দঘন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বরিশালের মন্ডপভিত্তিক দুর্গা পূজা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখানকার মানুষের মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক।










































