আতঙ্কিত রোগী-স্বজন
পাঁচ বছরে ছয়বারের বেশি অগ্নিকাণ্ড, ঝুঁকিতে শেবাচিম হাসপাতাল
জুন ০৫ ২০২৬, ২২:৫১
ফাহিম ফিরোজ : দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা যেন নিয়মিত আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে হাসপাতালটিতে ছয়বারের বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন আতঙ্কে অন্তত তিন রোগীর মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে। বারবার এমন ঘটনা ঘটলেও হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রোগী, স্বজন ও সচেতন নাগরিকরা।
সর্বশেষ গত ২ জুন রাত পৌনে ১১টার দিকে হাসপাতালের কেমিক্যাল স্টোররুমে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় ৩০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন লাগার ঘটনায় হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও আগুনের কারণ জানতে তদন্ত শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। বরিশাল ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. সেলিম জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে তদন্ত চলছে।
এর আগে চলতি বছরের ১৮ মার্চ রাতে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের পঞ্চম তলার একটি পরিত্যক্ত কক্ষে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়লে রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে কয়েকজন আহত হন। ওই ঘটনায় অক্সিজেন সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দুই রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। নিহতরা হলেন পটুয়াখালী সদর উপজেলার বদরপুর এলাকার কাজী আতাউর রহমান (৮০) এবং বরিশাল নগরের বারৈজ্জারহাট এলাকার আবুল হোসেন হাওলাদার (৬৫)।
এর আগে ২০২৪ সালের ৪ জুন হাসপাতালের তৃতীয় তলার কিডনি ডায়ালাইসিস বিভাগে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা আহত হন। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
একই বছরের ১৩ অক্টোবর হাসপাতালের নিচতলায় বৈদ্যুতিক লাইনে ত্রুটির কারণে তীব্র ধোঁয়া সৃষ্টি হয়। ধোঁয়া দ্রুত পুরো পাঁচতলা ভবনে ছড়িয়ে পড়লে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
২০২২ সালের ১৬ জুলাই হাসপাতালের নিচতলায় লিফটের পাশে আগুনের ঘটনা ঘটে। খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন ওয়ার্ডের রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও নার্সরা আতঙ্কে হাসপাতাল চত্বরে নেমে আসেন। তবে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই আগুন নিভে যায়।
সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর। হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) আগুন লাগার পর কেন্দ্রীয় অক্সিজেন লাইনে বিস্ফোরণ ঘটে। ওই ঘটনায় এক রোগীর মৃত্যু হয়। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত্যুর সঙ্গে আগুনের সরাসরি সম্পর্ক অস্বীকার করেছিল, তবে স্বজনরা আতঙ্কজনিত কারণকে দায়ী করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালটিতে সংঘটিত অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের পেছনে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, অসাবধানতাবশত ফেলে রাখা বিড়ির চুকা এবং রাসায়নিক পদার্থের অনিরাপদ সংরক্ষণকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিভিন্ন বিভাগে ব্যবহৃত হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড সংরক্ষণ নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডসহ দাহ্য ও সংবেদনশীল রাসায়নিক পদার্থ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নির্ধারিত কক্ষে সংরক্ষণ করার কথা। কিন্তু হাসপাতালটিতে পর্যাপ্ত আধুনিক সংরক্ষণাগার না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ কক্ষেই এসব রাসায়নিক রাখা হয়। ফলে তাপমাত্রার পরিবর্তন, বাতাসের আর্দ্রতা কিংবা অসতর্ক নড়াচড়ার কারণে রাসায়নিক বিক্রিয়া সৃষ্টি হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটির মূল অবকাঠামো নির্মাণের সময় আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। ভবনটিতে পর্যাপ্ত ফায়ার এক্সিট বা জরুরি নির্গমন পথ নেই। একই সঙ্গে শুরু থেকেই পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়নি। সময়ের সঙ্গে রোগীর চাপ ও সেবার পরিধি বাড়লেও সেই অনুপাতে নিরাপত্তা অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি তৃতীয় স্তরের হাসপাতালের জন্য স্বয়ংক্রিয় ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম, স্প্রিংকলার, পর্যাপ্ত ফায়ার এক্সিট, আধুনিক কেমিক্যাল স্টোরেজ এবং নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পুরোনো অবকাঠামো ও সীমিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে হাসপাতালটি এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ঘনঘন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়লেও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহযোগিতায় চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের প্রাথমিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় কীভাবে রোগীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া যাবে এবং আতঙ্ক এড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে, সে বিষয়েও সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশিক্ষণের ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং রোগীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমাতে হাসপাতালের অবকাঠামোগত সংস্কার এবং আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপনের বিকল্প নেই।
দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় দুই কোটিরও বেশি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এই হাসপাতাল। কিন্তু একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো অবকাঠামো, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি দ্রুত দূর করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।









































