ক্ষমতার করিডোর থেকে মাদকসেবীদের আখড়া, করুণ পরিণতি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের
জুন ০৬ ২০২৬, ২০:৪৫
ফাহিম ফিরোজ : এক সময় যে ভবন থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো বরিশাল জেলার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, যেখানে নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকতো দিন-রাত, আজ সেই ভবন দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত ও নীরব এক ধ্বংসস্তূপ হিসেবে। নগরীর বিবির পুকুর পাড়ে সোহেল চত্বরে অবস্থিত আওয়ামী লীগ কার্যালয় এখন মাদকসেবী ও নেশাখোরদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে ভবনের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার হচ্ছে উন্মুক্ত প্রসাব-পায়খানার স্থান হিসেবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের প্রধান ফটক ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের কালো দাগ এখনও স্পষ্ট। ভেতরের বেশিরভাগ কক্ষ পরিত্যক্ত। কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা, আবার কোথাও দুর্গন্ধে দাঁড়িয়ে থাকাই কষ্টকর। ভবনের আশপাশেও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত থাকায় ভবনটি এখন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ভবনের বিভিন্ন কক্ষে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। অনেকেই সেখানে গাঁজা ও অন্যান্য মাদক সেবন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রাজু বলেন, “এক সময় এখানে নেতাকর্মীদের ভিড় ছিল। এখন ভবনের অবস্থা খুবই খারাপ। সন্ধ্যার পর অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা বাড়ে। অনেকেই এখানে মাদক সেবন করে।” আরেক বাসিন্দা মালেক বলেন, “ভবনটি এখন কার্যত পাবলিক টয়লেটে পরিণত হয়েছে। দুর্গন্ধের কারণে আশপাশ দিয়ে চলাচল করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।”
জানা যায়, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন এই এনএক্স ভবন থেকেই দীর্ঘদিন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, দলীয় বৈঠক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র ছিল এই কার্যালয়।
সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর সময় ভবনটি আধুনিকায়ন করা হয়। নতুন অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করে এটিকে আরও কার্যকর কার্যালয়ে রূপ দেওয়া হয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ভবনটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনে পুড়ে যায় ভবনের বিভিন্ন অংশ। ভেঙে ফেলা হয় আসবাবপত্র ও অভ্যন্তরীণ স্থাপনা। এরপর থেকে কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে ভবনটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভবনটির কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এতটাই বেশি যে এটি পুনঃসংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করা কঠিন। ফলে ভবিষ্যতে ভবনটির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
এক সময় জেলার রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই ভবন আজ সময়ের নির্মম বাস্তবতার নীরব সাক্ষী। যেখানে একসময় রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ হতো, সেখানে এখন ভেসে আসে শুধুই পরিত্যক্ততার গন্ধ।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, ছাত্র জনতার হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ পুরো ভবনটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এটি সংস্কারের কোন পরিকল্পনা নেই। তবে ভবনটি পুনঃনির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।
নগরবাসীর দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত এই পরিত্যক্ত ভবন দ্রুত অপসারণ, পুনর্র্নিমাণ অথবা বিকল্প কাজে ব্যবহার করা হোক। অন্যথায় এটি ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।









































