দেশে শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র
সহিংসতা, নির্যাতন ও বঞ্চনায় অন্ধকারে শিশুর শৈশব
ফাহিম ফিরোজ, বরিশাল : দেশের শিশুরা আজ নানা ধরনের সহিংসতা, নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার। মৌলিক অধিকার, নাগরিক সেবা, শিক্ষা, নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনের চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি শিশু অধিকার বিষয়ক সংস্থা সেইফগার্ডিং চিলড্রেন বাই এনগেজিং ইয়ুথ আয়োজিত এক উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক তথ্য।

অনুষ্ঠানটি বুধবার (২২ অক্টোবর) সকালে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব ও তথ্য উপস্থাপন করেন স্ক্যান বাংলাদেশের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন।
৪০ ভাগ শিশু নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত:
দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে।
শিশুশ্রমে নিযুক্ত ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু:
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত, যার মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত। এদের অধিকাংশই কাজ করছে গার্মেন্ট, ওয়ার্কশপ, চা বাগান ও নির্মাণ খাতে।
যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের ভয়াবহ পরিসংখ্যান:
চলতি বছরে ৩৯৭ জন শিশু ধর্ষণের শিকার, এর মধ্যে ১৫ জন নিহত হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ১২টি। এছাড়া পথেঘাটে যৌন হয়রানির শিকার ৬০ শিশু, মামলা হয়েছে মাত্র ২৯টি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ২৭ শিশু, যার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ৬টি। অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ৭ শিশু, এর মধ্যে ২ জন আত্মহত্যা করেছে।
পারিবারিক সহিংসতা ও শিক্ষক নির্যাতনে প্রাণহানি:
পারিবারিক সহিংসতায় ৬৪ শিশু আক্রান্ত, যার মধ্যে ৪৭ শিশু নিহত। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ২৪টি।
অন্যদিকে শিক্ষক কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৮০ শিশু, এর মধ্যে ২ জন প্রাণ হারিয়েছে, অথচ মামলা হয়েছে মাত্র ৪টি।
ন্যায়বিচার থেকেও বঞ্চিত শিশুরা:
শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৯৩ শিশু, এর মধ্যে ৫৯ শিশু নিহত হলেও মামলা হয়েছে মাত্র ৩৮টি। এতে প্রতীয়মান, শিশু নির্যাতনের ঘটনায় বিচার পাওয়ার হার উদ্বেগজনকভাবে কম।
বাল্যবিবাহে বিশ্বে অষ্টম, মেয়েদের শিক্ষায় বৈষম্য:
বাংলাদেশ এখন বাল্যবিবাহে বিশ্বে অষ্টম স্থানে। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, দেশের ৫৯ শতাংশ মেয়ে শিশু উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, যা নারীশিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতির বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য :
স্ক্যান বাংলাদেশের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সমাজ, পরিবার ও প্রশাসন—সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল হতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।”
বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামাল বলেন, “শিশুদের অধিকার রক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর ক্ষেত্র। আমরা চাই প্রতিটি শিক্ষক যেন শিশুর অভিভাবকের মতো দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। প্রতিটি ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।” তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিক স্তর থেকেই শিশুদের নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুরক্ষিত ও সচেতন হয়ে গড়ে উঠবে।”
বরিশাল শ্রম অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন,“শিশুশ্রম বন্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। তবুও এখনো ঝুঁকিপূর্ণ খাতে শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি—এটা বাস্তবতা। এজন্য শুধু আইন নয়, সমাজ ও পরিবারকেও দায়িত্ব নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে শিশুশ্রম হ্রাসে কাজ করছি। একইসঙ্গে শিক্ষায় ফেরানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।”










































