মধুমাসে বরিশালের বাজারে রসালো লিচুর আমেজ, স্বাদে মুগ্ধ ক্রেতা, দামে অসন্তোষ

মে ২৩ ২০২৬, ২২:৩৫

ফাহিম ফিরোজ : গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের মাঝেও বরিশালের বাজারজুড়ে এখন স্বস্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে মধুমাসের অন্যতম জনপ্রিয় ফল লিচু। লালচে খোসার ভেতরে সাদা রসালো শাঁসের এই ফল দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, স্বাদেও তেমনি অতুলনীয়। মৌসুমের শুরুতেই বরিশাল নগরীর বিভিন্ন বাজার, ফুটপাত ও সড়কের পাশে জমে উঠেছে লিচুর অস্থায়ী বাজার। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠছে নগরীর ফলপট্টিগুলো।

বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড, লঞ্চঘাট, ফলপট্টি, গির্জা মহল্লা, সদর রোড, চৌমাথা, নতুন বাজার, বাংলাবাজার, রূপাতলী ও নথুল্লাবাদ এলাকায় এখন চোখে পড়ছে সারি সারি সাজানো লিচুর থোকা। দূর থেকে লাল রঙের ঝাঁকড়া থোকা দেখে অনেক পথচারীও থেমে যাচ্ছেন। কেউ দাম জিজ্ঞেস করছেন, কেউ আবার স্বাদ নিতে কিনে নিচ্ছেন কয়েকশ লিচু।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আকার, মান ও উৎপাদন এলাকার ভিত্তিতে প্রতি ১০০ লিচু ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের বোম্বাই, মাদ্রাজি ও রাজশাহীর বিখ্যাত লিচুর দাম সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলের লিচুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি থাকায় দামও তুলনামূলক চড়া।

নগরীর সদর রোড এলাকায় লিচু কিনতে আসা ক্রেতা আবুল হাসেম বলেন, “লিচু এমন একটা ফল, যা ছোট-বড় সবাই পছন্দ করে। বাচ্চারা তো লিচু দেখলেই খেতে চায়। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে দাম অনেক বেশি। তারপরও পরিবারের জন্য কিনতে হচ্ছে।”

ভাটিখানার গৃহবধূ তানজিলা আক্তার বলেন, “এখন বাজারে ফলের মধ্যে লিচুই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। বাচ্চারা খুব পছন্দ করে। তবে ৫০০ টাকা দিয়ে ১০০ লিচু কেনা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
বাজার রোডের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ সাহা কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন,“১০০ লিচু ৩০০ টাকায় কিনলাম। কিন্তু অনেক লিচুতেই শাঁস কম, আটি বড়। দাম আরেকটু কম হলে সাধারণ মানুষ বেশি করে কিনতে পারতো।”

লঞ্চঘাট এলাকায় লিচু বিক্রি করা ব্যবসায়ী রুবেল হোসেন বলেন, “এখন মৌসুমের একেবারে শুরু। সরবরাহ কম, আবার দূর-দূরান্ত থেকে আনতে পরিবহন খরচও বেশি পড়ছে। তাই দাম কিছুটা বেশি। কয়েকদিন পর বাজারে লিচু বাড়লে দামও কমে আসবে।”

নগরীর ফল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে রাজশাহী, দিনাজপুর ও যশোর অঞ্চল থেকে লিচু আসছে। পাইকারি বাজারেই দাম বেশি। তারপর ভাড়া, শ্রমিক খরচ মিলিয়ে খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যায়। তবে জুনের শুরুতে বাজার পুরোপুরি জমে উঠলে দাম সহনীয় হবে।”

শুধু নগরী নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকেও মানুষ বরিশালে এসে লিচু কিনছেন। অনেকে আবার আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠানোর জন্য বেশি পরিমাণে কিনে নিচ্ছেন। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মাঝে লিচুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। বিকেলের পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকেই লিচুর বাজারে ভিড় করছেন।

চিকিৎসকদের মতে, লিচুতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, খনিজ উপাদান ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। তবে অতিরিক্ত লিচু খেলে পেটের সমস্যা ও রক্তে শর্করার তারতম্য হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা। খালি পেটে অতিরিক্ত লিচু না খাওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এদিকে লিচুর পাশাপাশি বাজারে উঠতে শুরু করেছে আম, জাম, কাঁঠালসহ অন্যান্য মৌসুমি ফলও। ফলে বরিশালের ফলের বাজারে এখন মধুমাসের পূর্ণ আমেজ বিরাজ করছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বাজারে চাহিদা বেড়েছে। অনেকেই আত্মীয়-স্বজন ও অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য আগেভাগেই লিচু কিনছেন। ফলে মৌসুমের শুরুতেই লিচুর দাম তুলনামূলক বেশি রয়েছে।

সব মিলিয়ে, দামের কিছুটা চাপ থাকলেও স্বাদ ও মৌসুমি আকর্ষণের কারণে বরিশালের মানুষের কাছে লিচুর কদর কমেনি। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের কাছেই এখন লিচু যেন গ্রীষ্মের অন্যতম প্রিয় উপহার।