বরিশালে অপরাধের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী: দেড় বছরে ৩৯ খুন, ১১০ ধর্ষণ

জুলাই ০১ ২০২৬, ১৯:০০

ফাহিম ফিরোজ : বরিশালকে একসময় শান্ত জনপদ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে অবনতি ঘটেছে। খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চুরি, দস্যুতা ও নানা ধরনের সহিংস অপরাধের ঘটনায় দিন দিন বাড়ছে জনমনে আতঙ্ক। অপরাধ দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

বরিশাল জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত জেলার ১০টি থানা এলাকায় ৩৯টি হত্যাকাণ্ড, ৮টি ডাকাতি, ৭টি দস্যুতা, ১১০টি ধর্ষণ, ১৪২টি চুরি এবং ১৪৯টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এসব পরিসংখ্যানই জেলার অপরাধ পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। শুধু সংখ্যাই নয়, বরং সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা পুরো জেলাজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল সদর উপজেলার রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের বৌসেরহাট বাজার এলাকায় বিএনপি কর্মী দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী (৫০)-কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ড এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

চলতি বছরের ১৫ মার্চ বাবুগঞ্জে মাত্র ৯ বছর বয়সী শিশু রাইসাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। নিষ্ঠুর এ হত্যাকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং সারা দেশে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

চলতি বছরের ৩১ মে মুলাদী উপজেলার দড়িচর লক্ষ্মীপুর গ্রামে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আনোয়ার হোসেন ঢালী (৫৫)-কে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের আপন ভাই ও ভাতিজাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ ওঠে, যা পারিবারিক বিরোধের ভয়াবহ রূপ হিসেবে আলোচিত হয়।

গত বছরের ১৯ জুন উজিরপুর পৌর এলাকার ভিআইপি রোডে নিজ বাড়িতে আলেয়া বেগম (৬০) নামে এক বিধবা নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এই নির্মম ঘটনায় নারী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।

একই বছরের ২৭ জুলাই উজিরপুর উপজেলার বরাকোঠা ইউনিয়নের খাটিয়ালপাড়া গ্রামে মাদকাসক্ত ছেলের ছুরিকাঘাতে নিহত হন বাবা শাহ আলম খান (৬২)। পারিবারিক সম্পর্কের এমন মর্মান্তিক পরিণতি স্থানীয়দের নাড়িয়ে দেয়।

এছাড়া ১৭ নভেম্বর বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুর স্টিল ব্রিজ এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা রবিউল ইসলাম কুপিয়ে নিহত হন। রাজনৈতিক সহিংসতার এই ঘটনাও জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এদিকে হত্যা ছাড়াও ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতার মতো অপরাধের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ১১০টি ধর্ষণের ঘটনা নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।

বরিশালের পুলিশ সুপার এ.জেড.এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘‘আমি বরিশালে যোগ দিয়েছি ৩ মাস হয়েছে। এই সময়ের সময়ের মধ্যে আমরা আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি এবং এখনো করছি। বিশেষ করে মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স অব্যাহত আছে। বিচ্ছিন্ন যে আপরাধের ঘটনাগুলো হচ্ছে- এগুলোর অধিকাংশই জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে। বরিশাল জেলা পুলিশ আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণে সবসময় তৎপর রয়েছে।’’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল নগর কমিটির সম্পাদক মো. রফিকুল আলম বলেন, “অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধীরা যদি দ্রুত আইনের আওতায় এসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়, তাহলে অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ জোরদার করাও প্রয়োজন।”

আইন-শৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ দমনে শুধু অভিযান চালালেই হবে না; অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, মাদক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক সহিংসতা কমানো এবং বিচার প্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় বরিশালে অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

বরিশাল আদালতের অতিরিক্ত স্পেশাল পিপি অ্যাড. এস.এম. সরোয়ার হোসেন বলেন, “অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেপ্তার করলেই হবে না, অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। হত্যা, ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মামলাগুলোর তদন্ত নিরপেক্ষ ও দ্রুত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হওয়ার সুযোগ পায়। তাই তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন ও বিচার বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় এসে শাস্তি পায় এবং সমাজে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়।”