চলে গেলেন প্রবীণ সাংবাদিক ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টু, মিডিয়া পাড়ায় শোক
স্টাফ রিপোর্টর : দীর্ঘ অসুস্থতার পর মৃত্যুর কাছে হার মানলেন সৎ ও নির্ভিক, প্রবীণ সাংবাদিক, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, অ্যাডভোকেট মু. ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টু।
শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নি.শ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তিনি স্ত্রী, এক পুত্র ও এক কণ্যা সন্তানসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহি রেখে গেছেন।
এদিকে- প্রবীণ সাংবাদিক ও আইনজীবী মু. ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টুর মৃত্যুতে বরিশালে সাংবাদিক ও আইনজীবী মহলে সহকর্মীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রিয় মানুষকে শেষ বিদায় জানাতে তারা ছুটে যান মরহুমের আমানতগঞ্জের বাসা, প্রেসক্লাব এবং রিপোর্টার্স ইউনিটিতে। সেখানে ফুলেল শ্রদ্ধা, স্মৃতিচারণ এবং মরহুমের জন্য দোয়া করেন তারা। তার মৃত্যুতে শোক কর্মসূচি দিয়েছে বরিশাল প্রেসক্লাব। ক্লাব চত্বরে কালো পতাকা উত্তোলন এবং কালো ব্যাচ ধারণসহ স্মরণ সভা ও দোয়া অনুষ্ঠান কর্মসূচি দিয়েছে প্রেসক্লাব।
অন্যদিকে তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে ঢাকা পিজি হাসপাতালে ছুটে যান জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, ক্রাবের সহ-সভাপতি মাসুম মিজান, সমাজসেবক আবিদ হোসেন বাবুসহ অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ।
এদিকে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে মু. ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টু নিথর দেহে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে বরিশাল প্রেসক্লাব চত্বরে পৌঁছায়। এসময় সেখানে এক হৃদয় বিদারক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। পরে মু. ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টুর প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বরিশাল প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম খসরু ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনসহ সদস্য এবং সহযোগী সদস্যবৃন্দ। পরে তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া-মোনাজাত করেন তারা। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন এবং পত্রিকার পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ায় হয় বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটিতে। সেখানে ইউনিটির পক্ষ থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সন্ধ্যার পর মরহুমের নিথর দেহ পৌঁছায় নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকার নিজ বাড়ির আঙিনায়। লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সে সেখানে পৌঁছাতেই স্বজনদের আর্তনাদে এলাকার পরিবেশ ভরি হয়ে ওঠে। পরে বাদ এশা আমানতগঞ্জ টিবি হাসপাতাল মাঠে মরহুমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাংবাদিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠনসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। পরে নগরীর মুসলিম গোরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয় ইসমাইল হোসেন নেগাবানকে।
এদিকে সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক এবং আইনজীবী ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টুর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন- এমপি, বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার, বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, বরিশাল প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম খসরু, সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ ইমন, বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আনিসুর রহমান খান স্বপন, সাধারণ সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ, সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি শুভংকর চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক স্নেহাংশ বিশ্বাস প্রমুখ।
পৃথক বিবৃতিতে তাঁরা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরত ও তাঁর শোকসন্তাপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
জানাগেছে, মু. ইসমাইল হোসেন নেগাবান বানারীপাড়া উপজেলার চাখার খলিশাকোটা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর চাখার কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন কলেজ থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে অনার্স-মাষ্টার সম্পন্ন করেন। এছাড়া বরিশাল “ল” কলেজ থেকে এলএলবি সম্পন্ন করে আইন পেশায় যুক্ত হন। তার বাবা ছিলেন একজন শিক্ষক।
১৯৮১ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক রাজনীতি পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি দেন ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টু। এরপর লোকবানী, দৈনিক নব অভিযানে সাংবাদিকতা করেন তিনি। সবশেষ মৃত্যুর আগপর্যন্ত ডেইলি অবজারভার পত্রিকায় বরিশাল ব্যুরো চিফ হিসেবে কর্মরত ছিলেন ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টু।
তিনি বরিশাল প্রেসক্লাবে সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি পদে থেকে সাংবাদিক অঙ্গনে নেতৃত্বও দিয়েছেন। সবশেষ ২০২১ সালে বরিশাল প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং তার আগে ১৯৯৩ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এছাড়া বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতিতেও তিনি নির্বাচিত সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পদে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়া বরিশাল জেলার জিপি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন ইসমাইল হোসেন নেগাবান।
কর্মজীবনে তিনি একজন সৎ এবং নিষ্ঠাবান মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। ঘুষ, অনিয়ম এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বোচ্ছার ছিলেন তিনি। সত্যকে কখনো মিথ্যা দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করেননি।
ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টুর বাল্যবন্ধু ও বরিশাল প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য কাজী মকবুল হোসেন বলেন, ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টু একজন প্রকৃত সৎ লোক ছিলেন। তিনি কখনো অন্যায়ের সাথে আপশ করেননি। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের “ল অফিসার” পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। সেখানে ঘুষের টাকা লেনদেন হওয়ায় দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে একজন সাধারণ আইনজীবী হিসেবে বরিশাল আদালতে কর্মজীবন শুরু করেন। জিপি পদে থাকাবস্থায় চাইলে সে অনেক টাকা উপার্জন করতে পারতো। কিন্তু সেখানেও তিনি সততা এবং নীতি নিয়ে কর্মজীবন পার করেছেন।
এদিকে- বরিশাল প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি জাকির হোসেন জানান, ইসমাইল হোসেন নেগাবান মন্টু অনেক দিন ধরেই হিপ জয়েন্টের সমস্যায় ভুগছিলেন। এরপর গত ৩১ মার্চ তাকে ঢাকা পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে গত ২৫ এপ্রিল সেখানে তার হিপ জয়েন্টে সফল অস্ত্রপচার হয়। এরপর সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অনতি ঘটে। এরপর শনিবার সকালে তিনি দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে পরকালে পারি জমান।










































