আগুন-হাতুড়ির শব্দে মুখর বরিশালের হাটখোলা কামারপট্টি

মে ১৬ ২০২৬, ২০:৫৪

ফাহিম ফিরোজ : ভোর গড়াতেই বরিশাল নগরীর হাটখোলা কামারপট্টিতে শুরু হয় আগুন আর লোহার যুদ্ধ। ছোট ছোট অন্ধকার কারখানার ভেতরে জ্বলছে কয়লার আগুন, তার লালচে আঁচে গরম হচ্ছে লোহা। মুহূর্তেই সেই গরম লোহার ওপর পড়ছে ভারী হাতুড়ির আঘাত। টুংটাং শব্দে মুখর পুরো এলাকা। কেউ তৈরি করছেন কুরবানির দা, কেউ বটি, কেউবা চাপাতিতে দিচ্ছেন শেষ মুহূর্তের ধার। কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে এখন এভাবেই ব্যস্ত সময় পার করছেন বরিশালের কামারপট্টির কারিগররা।

বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ঈদের মৌসুমই তাদের সবচেয়ে বড় কর্মযজ্ঞ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে কাজ। আগুনের উত্তাপ, ধোঁয়া আর ঘামের মধ্যে দিন কাটলেও মুখে ক্লান্তির চেয়ে বেশি দেখা যায় আশার ছাপ। কারণ, কুরবানির ঈদকে ঘিরেই আসে তাদের বছরের সবচেয়ে বড় আয়।

তবে এবার ব্যস্ততা থাকলেও এখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি বাজার। কারিগরদের ভাষ্য, কাজের চাপ বাড়লেও ক্রেতার সংখ্যা এখনো তুলনামূলক কম। সাধারণত ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকে বেচাকেনা বাড়তে শুরু করে। তাই শেষ সময়ে বাজার চাঙা হওয়ার অপেক্ষায় আছেন তারা।

কামারপট্টির কারিগর রতন কর্মকার বলেন, “এখন কাজ তো অনেক বেশি। সারাদিন আগুনের সামনে বসে থাকতে হয়। কিন্তু বিক্রি এখনও তেমন শুরু হয় নাই। মানুষ শেষ সময়েই বেশি কিনে।”

কারিগর রিপন ও সালাম আক্ষেপ করে বলেন, “লোহার দাম বাড়ছে, কয়লার দাম বাড়ছে, কিন্তু আমরা জিনিসের দাম সেইভাবে বাড়াইতে পারি না। বেশি দাম বললে মানুষ অন্য জায়গায় চলে যায়। লাভ কম হলেও কাজ তো বন্ধ রাখা যাবে না।”

কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও যে পরিমাণ কয়লা ও লোহা কিনতে কম খরচ হতো, এখন একই জিনিস কিনতে খরচ হচ্ছে অনেক বেশি। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও বাজারে প্রতিযোগিতা আর ক্রেতাদের সামর্থ্যের কারণে তারা দাম খুব একটা বাড়াতে পারছেন না। ফলে দিন শেষে লাভের অঙ্কও কমে যাচ্ছে।

তবুও থেমে নেই কামারপট্টির জীবন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পেশাকে আঁকড়ে রেখেছেন অনেকে। কেউ বাবার কাছ থেকে শিখেছেন, কেউ দাদার হাত ধরে এসেছেন এই কাজে। আধুনিক যন্ত্রপাতির যুগেও আগুন, হাতুড়ি আর দক্ষ হাতের সমন্বয়ে তৈরি এসব দা-বটি এখনও কুরবানির ঈদে মানুষের প্রথম পছন্দ।

সরেজমিনে দেখা যায়, কোনো কারখানায় আগুনে লোহা পুড়িয়ে আকার দেওয়া হচ্ছে, কোথাও পুরোনো চাপাতি ধার করে নতুনের মতো করা হচ্ছে। ধোঁয়াভরা গরম পরিবেশেও থেমে নেই কারিগরদের হাত। কারণ, ঈদের এই মৌসুমই তাদের জীবিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।

কামারপট্টির কারিগরদের এখন একটাই প্রত্যাশা—ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বাড়বে ক্রেতাদের ভিড়। শেষ মুহূর্তে ভালো বিক্রি হলে আগুন আর ঘামের এই শ্রম কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে তাদের সংসারে।