র্যাবের অভিযানে আটক ৮
শেবাচিম হাসপাতালে বেপরোয়া দালাল চক্র
মে ১২ ২০২৬, ২১:২৭
স্টাফ রিপোর্টার : বরিশালের সর্ববৃহৎ সরকারি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতাল। প্রতিদিন বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে হাজারো রোগী ও স্বজন চিকিৎসার আশায় ছুটে আসেন এখানে। কিন্তু হাসপাতালের প্রবেশমুখ থেকেই রোগীদের ঘিরে ধরে সক্রিয় দালাল চক্র। অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের ভুল তথ্য, প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রতারণার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অবশেষে এ চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ৮ জনকে আটক করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও র্যাব-৮।
মঙ্গলবার (১২ মে) সকালে বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাজন রায় ও র্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর মোঃ আশিক ইকরাম সৌরভের নেতৃত্বে শেবাচিম হাসপাতালে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে ৬ জন নারী ও ২ জন পুরুষ দালালকে আটক করা হয়। আটক প্রত্যেককে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০০ টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরও দণ্ডের আদেশ প্রদান করেন।
আটক সাজাপ্রাপ্তরা হলেন, শাপলা ডায়াগনস্টিকের দালাল ঝালকাঠি জেলার চাচইর হবিকাঠি এলাকার তাসনিম জাহান মিম (২৩), রংধনু ডায়াগনস্টিক এর দালাল বরিশাল সদর উপজেলার রায়পাশা-কড়াপুর এলাকা হাফিজা আক্তার, রংধনু ডায়াগনস্টিকের দালাল বরিশাল সদরের কামদেবপুর এলাকার সুমি আক্তার ওরফে হানি ট্রাপ সুমি (১৯), রয়েল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার চৈতা গ্রামের লাবনী আক্তার নাজমা (২৮),পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ এলাকার ছাবিনা (৩০), শাপলা ডায়াগনস্টিকের অপর দালাল বরিশাল নগরীর কাশিপুর এলাকার আয়শা সিদ্দিকা (৩০), সাইন্স ল্যাব ডায়গনস্টিক এর দালাল বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই এলাকার মো. রুবেল (২২) এবং বরিশাল নগরীর কাশিপুর এলাকার রুমান সরদার (১৭) ।
দালালদের দৌরাত্ম্য :
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন্দ্র এমনকি ওয়ার্ডের সামনেও সক্রিয় থাকে দালালরা। নতুন রোগী এলেই তারা ঘিরে ধরে বিভিন্ন ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অনেক সময় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বা পরীক্ষা সম্ভব নয় বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রোগীদের বাইরে পাঠানো হয়। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা জানিয়েছেন, দালালদের কারণে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
রুপাতলী থেকে আসা রোগী ফারুক হোসেন বলেন, “হাসপাতালে ঢোকার পরই কয়েকজন এসে বলে তারা দ্রুত ডাক্তার দেখিয়ে দিবে। পরে বিভিন্ন পরীক্ষা বাইরে করতে বলে। আমরা গরিব মানুষ, কার কথা বিশ্বাস করবো বুঝতে পারি না।”
চিকিৎসাসেবায় চরম ভোগান্তি:
সচেতন মহলের অভিযোগ, দালাল চক্রের কারণে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। অনেক রোগী জরুরি চিকিৎসা না পেয়ে দালালদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে সময় নষ্ট করছেন। এতে রোগীর জীবনও ঝুঁকিতে পড়ছে। হাসপাতালের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে দালালদের অবাধ বিচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ। তাদের দাবি, মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হলেও স্থায়ীভাবে দমন করা যাচ্ছে না এই চক্রকে। ফলে কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও পরে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে দালালরা।
প্রশাসনের কঠোর অবস্থান:
অভিযান শেষে র্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর মোঃ আশিক ইকরাম সৌরভ বলেন, “হাসপাতালে রোগীদের হয়রানি ও প্রতারণা বন্ধে আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
সমাধান চান রোগী ও স্বজনরা:
সাধারণ মানুষের দাবি, শুধুমাত্র অভিযান নয়, হাসপাতালের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি বাড়ানো, তথ্যসেবা বুথ চালু, সিসিটিভি মনিটরিং জোরদার এবং হাসপাতাল প্রশাসনের সক্রিয় তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দালালদের সঙ্গে জড়িত অসাধু কর্মচারী বা সিন্ডিকেট থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বরিশাল শেবাচিম হাসপাতাল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের শেষ ভরসাস্থল। সেই হাসপাতালে যদি দালাল চক্রের ভয়েই রোগীদের চলাফেরা করতে হয়, তবে প্রশ্ন উঠছে— নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবে কে?










































