স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই, কার্যকর নয় কাউন্সেলিং সেন্টার

ছয় বছরে আট ববি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, ১৬ জনের চেষ্টা

জুলাই ২৫ ২০২৬, ২২:২৭

ফাহিম ফিরোজ : একের পর এক শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যু যেন অজানা এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি)। গত ছয় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত আট শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে ছয়জনই নারী। একই সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন আরও অন্তত ১৬ শিক্ষার্থী। এসব ঘটনার অধিকাংশের পেছনে উঠে এসেছে মানসিক অবসাদ, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সংকট, সম্পর্কের জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো বিষয়। অথচ শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো নেই কোনো স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। ২০২৪ সালে চালু হওয়া কাউন্সেলিং অ্যান্ড গাইডেন্স সেন্টারও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কার্যকরভাবে সেবা দিতে পারছে না। ফলে মানসিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীরা সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পড়াশোনার চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক টানাপোড়েন, সম্পর্কের ভাঙন এবং ক্যারিয়ার নিয়ে উদ্বেগ অনেক শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। কিন্তু এসব সংকট নিয়ে খোলামেলা কথা বলার পরিবেশ কিংবা পেশাদার সহায়তার সুযোগ না থাকায় অনেকেই নীরবে কষ্ট সহ্য করেন। অনেকেই সামাজিক প্রতিক্রিয়া বা নেতিবাচক মন্তব্যের ভয়ে নিজের সমস্যার কথা গোপন রাখেন। সহপাঠীদের সঙ্গে আলোচনা করলেও পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের অভাবে সমস্যার কার্যকর সমাধান হয় না।

সবশেষ গত ২২ জুলাই রাতে ক্যাম্পাস-সংলগ্ন খালপাড় সড়কের একটি ফ্ল্যাট থেকে জিওলজি অ্যান্ড মাইনিং বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী উচ্ছ্বাস কর্মকারের (২৭) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। চার দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ পাওয়া যায়। তার পরিচিত জুনিয়রদের ভাষ্য, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নানা সমস্যায় তিনি দীর্ঘদিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন।

এর আগে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শুভ বৈরাগী আত্মহত্যা করেন। ২০২৪ সালে আত্মহত্যা করেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অর্পণা দাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বৃষ্টি সরকার, স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী দেবশ্রী রায় এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শেফা নূর ইবাদি। ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন একটি ছাত্রীনিবাস থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিন রিভানার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২০২০ সালের ২ আগস্ট নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী সুপ্রিয়া দাস।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর পেছনে সম্পর্কের জটিলতা, পারিবারিক বিরোধ, ব্যক্তিগত হতাশা ও দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের বিষয় সামনে এসেছে। তবে এসব সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে ২০২৪ সালের ১০ মার্চ উদ্বোধন করা হয় ‘বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সেলিং অ্যান্ড গাইডেন্স সেন্টার’। কিন্তু দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ হয়নি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কাউন্সেলিং সেন্টার থাকলেও নিয়মিত কোনো কাউন্সেলর বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ না থাকায় এটি কার্যত অকার্যকর হয়ে আছে।

ববির সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মেহরাব হোসেন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার মতো নিরাপদ পরিবেশ এখনো গড়ে ওঠেনি। অনেক শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত সংকটে ভুগলেও কোথায় যাবে, কার কাছে সাহায্য চাইবে—তা জানে না। কাউন্সেলিং সেন্টার চালু থাকলেও সেখানে নিয়মিত সেবা না থাকায় শিক্ষার্থীরা কোনো উপকার পাচ্ছে না। একজন স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগ এখন সময়ের দাবি।”
আরেক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের অনেকেই পরিবার থেকে দূরে থাকি। নানা ধরনের মানসিক চাপ থাকে। কিন্তু সমস্যার কথা শোনার বা গোপনীয়ভাবে পরামর্শ দেওয়ার মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় বন্ধুরাই একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে, যা সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।”

শিক্ষার্থীদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত ও গোপনীয় কাউন্সেলিং সেবা, প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সংকটকালীন সহায়তা (ক্রাইসিস সাপোর্ট) এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালা চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষক, অভিভাবক ও সহপাঠীদেরও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে আরও সংবেদনশীল হতে হবে।

এ বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মামুন অর রশিদ বলেন, “স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইউজিসিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হবে। আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পরিবার ও সমাজকেও একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সর্বোপরি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে বিলাসিতা নয়, বরং মৌলিক শিক্ষাসহায়ক সেবা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সময়মতো পেশাদার সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিক্ষার্থীকে হতাশা ও সংকট থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তাই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্রুত স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং কাউন্সেলিং সেন্টারকে পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।