মাহে রবিউল আউয়াল : নবীজির আদর্শে শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠার আহ্বান

সেপ্টেম্বর ০৩ ২০২৬, ১৮:২৩

মুহাম্মাদ আব্দুল আউয়াল : মাহে রবিউল আউয়াল। মুসলমানদের কাছে এ মাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানবতার মুক্তিদূত, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত এ মাস আমাদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি বেদনারও। একই সঙ্গে এটি আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মশুদ্ধির মাস—আমরা কতটা রাসূলের আদর্শ অনুসরণ করছি, সেটি ভেবে দেখার সময়।

আল-কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন—“তিনিই (আল্লাহ) আপনাকে প্রেরণ করেছেন রাসূল হিসেবে সত্য দ্বীন ও হেদায়েত সহকারে, যা আপনি বিজয়ী করবেন অন্যান্য দ্বীনের উপরে, তা মুশরিকদের নিকট যতই অপছন্দনীয় হোক।”

আরও বলা হয়েছে—“তোমাদের জন্য রাসূলের মধ্যেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পূর্বে আরব সমাজ ছিল নানা অনাচার ও অবিচারে পরিপূর্ণ। নারীর কোনো সামাজিক মর্যাদা ছিল না। নারীদের জীবিত কবর দেওয়া হতো। মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং দাস হিসেবে কেনাবেচা করা হতো। অন্যায়, জুলুম, নিষ্পেষণ, হিংসা, সংঘাত ও হত্যাসহ নানা সামাজিক ব্যাধি সমাজকে গ্রাস করেছিল।

এমন একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে মহান আল্লাহ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্য দ্বীন ও হেদায়েতসহ প্রেরণ করেন। তাঁর দাওয়াত ছিল মানুষের মুক্তির দাওয়াত—অন্যায় থেকে ন্যায়, অশান্তি থেকে শান্তি এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসার আহ্বান।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মাঝে আল্লাহর একত্ববাদ ও ন্যায়-ইনসাফের শিক্ষা প্রচার করেছেন। মানুষকে নৈতিকতা, মানবিকতা, ভ্রাতৃত্ব ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর আদর্শে নারী পেয়েছে মর্যাদা, দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষ পেয়েছে অধিকার এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ন্যায়বিচারের মূল্যবোধ।

রাসূলের জীবন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে—শুধু ব্যক্তিজীবনে ভালো মানুষ হওয়াই যথেষ্ট নয়; সমাজের অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্য দূর করার জন্যও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যায়, বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সত্ত্বেও মানুষ নানা সংকটে জর্জরিত। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও সংঘাত, কোথাও বৈষম্য, কোথাও দুর্নীতি ও অনিয়ম। মানুষ শান্তির জন্য নানা মতবাদ, আইন ও পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এখনো অনেক দূরের বিষয়।

এই বাস্তবতায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশনা হতে পারে। তাঁর শিক্ষা আমাদের ন্যায়, মানবিকতা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়।

বিশেষ করে বাংলাদেশে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় ন্যায়, সততা, জবাবদিহি এবং মানুষের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

আমরা যদি সত্যিই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসি, তাহলে তাঁর আদর্শকে শুধু আলোচনা ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তার বাস্তব প্রয়োগ ঘটাতে হবে।

মাহে রবিউল আউয়ালের প্রকৃত শিক্ষা এখানেই—রাসূলের জীবনকে জানা, তাঁর আদর্শকে বোঝা এবং সেই আদর্শ অনুযায়ী নিজেদের জীবন গড়ে তোলা।

আসুন, আমরা হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করি। অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দাঁড়াই। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করি। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও মতের পার্থক্য ভুলে প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করি।

উম্মতে মুহাম্মাদী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। একই সঙ্গে আল্লাহর বিধান ও রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনার চেষ্টা করা।

মাহে রবিউল আউয়াল হোক আত্মশুদ্ধির মাস, হোক রাসূলের আদর্শ অনুসরণের নতুন অঙ্গীকারের মাস। আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় হোক এই মাসের অন্যতম শিক্ষা।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন এবং দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতে কল্যাণ দান করুন। আমিন।

মুহাম্মাদ আব্দুল আউয়াল
ফকিরবাড়ী রোড, ১৭নং ওয়ার্ড, বরিশাল মহানগরী
মোবাইল: ০১৯১৫-৫১৯৫৩৪