৭ বছরেও খোলেনি দলিল লেখক রিয়াজ হত্যার জট
স্ত্রী লিজা ও পরকীয়া প্রেমিক মাসুমকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে রিয়াজ হত্যার রহস্য
এপ্রিল ২৪ ২০২৬, ২২:৪৫
ফাহিম ফিরোজ : বরিশালের লোমহর্ষক ও বহুল আলোচিত দলিল লেখক রেজাউল করিম রিয়াজ হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পার হলেও এখনো কুল-কিনারা করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থাগুলো। ফলে একদিকে যেমন ন্যায়বিচার বিলম্বিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত খুনিরা রয়ে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে—এমন অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। একাধিক সংস্থা দফায় দফায় তদন্ত করলেও এখনো পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি তারা।
মামলার বাদী ও নিহতের বড় ভাই মনিরুল ইসলাম রিপনের দাবি, তদন্তকারীরা প্রকৃত খুনিদের আড়ালে রেখে বারবার “ছিছকে চোর” বা গৌণ ব্যক্তিদের প্রধান আসামী বানিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করছেন। এতে মামলাটি ভিন্নখাতে পরিচালিত হচ্ছে এবং বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে। তিনি অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই একটি প্রভাবশালী চক্রকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, মামলার প্রধান আসামী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন নিহত রিয়াজের স্ত্রী আমিনা আক্তার লিজা এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকা মোঃ মাসুম হোসেন। এছাড়াও আরও কয়েকজন আসামীকে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—আসামীদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, যা একদিকে ঘটনার নৃশংস চিত্র তুলে ধরেছে, অন্যদিকে তৈরি করেছে একাধিক অসঙ্গতি ও সন্দেহ।
প্রধান আসামী আমিনা আক্তার লিজা তার জবানবন্দিতে বলেন, প্রায় চার বছর আগে রিয়াজের সঙ্গে তার বিয়ে হলেও তার আগে দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক ছিল। রিয়াজ পেশায় দলিল লেখক ছিলেন এবং মাসুম হোসেন তার সহকর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একপর্যায়ে পারিবারিক কলহের সুযোগে মাসুম তার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে থাকে এবং বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
লিজার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে স্বামীর সঙ্গে বকাঝকার পর তিনি মানসিকভাবে ক্ষুব্ধ ছিলেন। ওই অবস্থায় তিনি মাসুমের সঙ্গে কথা বলেন এবং মাসুম সন্ধ্যার পর বাড়িতে আসার কথা জানায়। রাতে মাসুম ও তার এক সহযোগী বাড়িতে এসে তাকে ঘুমের ট্যাবলেট দেয় এবং তা স্বামীর দুধে মিশিয়ে দিতে বলে। তিনি সেই অনুযায়ী দুধে ট্যাবলেট মিশিয়ে দেন।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, গভীর রাতে তার স্বামী দুধ পান করে ঘুমিয়ে পড়ার পর মাসুম ও তার সহযোগী লুকিয়ে থাকা স্থান থেকে বের হয়ে আসে। তারা তাকে জোর করে স্বামীর পাশে বসিয়ে রাখে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে রিয়াজের ওপর হামলা চালায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রিয়াজ তখন অচেতন অবস্থায় ছিলেন এবং কোনো প্রতিরোধ করতে পারেননি। একজন মুখ চেপে ধরে রাখে এবং অন্যজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করে। এরপর তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
তবে এই জবানবন্দির সঙ্গে মামলার অন্যান্য আসামীদের বক্তব্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। সহ-আসামীদের কেউ কেউ দাবি করেছে, তারা মূলত চুরির উদ্দেশ্যে বাড়িতে প্রবেশ করেছিল এবং ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হত্যায় রূপ নেয়। আবার কেউ বলেছে, সিঁধ কেটে ঘরে ঢোকার পর রিয়াজ টের পেয়ে গেলে তাকে আঘাত করা হয়। এসব বক্তব্য একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশেষ করে সিঁধ কাটার বিষয়টি নিয়ে রয়েছে দ্বন্দ্ব। একদিকে আসামীরা বলছে, তারা সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকেছে; অন্যদিকে লিজা দাবি করেন, যে সিঁধ দেখানো হয়েছে তা দিয়ে কোনো মানুষের প্রবেশ সম্ভব নয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—সিঁধ কাটা কি সত্যিই ঘটনার অংশ, নাকি এটি পরবর্তীতে তৈরি করা কোনো বিভ্রান্তি?
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব জবানবন্দি যাচাই করতে প্রয়োজন ছিল শক্ত প্রমাণ—যেমন ফরেনসিক রিপোর্ট, মোবাইল কল রেকর্ড, ঘটনাস্থলের আলামত বিশ্লেষণ। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অগ্রগতি না থাকায় মামলাটি এখনো অনিশ্চয়তায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
তদন্তে উঠে আসা ১ নম্বর আসামী মোঃ শাকিল হাওলাদারের জবানবন্দিতে দাবি করা হয়েছে, মূল উদ্দেশ্য ছিল চুরি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বরিশাল নরুঘাট এলাকায় গাঁজা সেবনের সময় জলিলের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং সেখান থেকেই পরিকল্পনার সূত্রপাত। শাকিল জানায়, তারা রিয়াজকে একজন “মহুরী” হিসেবে চিনত এবং তার কাছে টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালঙ্কার থাকার ধারণা থেকেই বাড়িতে একাধিকবার যাওয়ার চেষ্টা করে। প্রথম দুইবার ব্যর্থ হওয়ার পর অস্ত্র—দা ও খুর—নিয়ে পুনরায় যায়। শাকিলের বক্তব্যে বলা হয়, সে সিঁধ কেটে ঘরে ঢোকে, রিয়াজ টের পেলে জলিল ও রায়হান তাকে আঘাত করে এবং সে দ্রুত মোবাইল নিয়ে পালিয়ে যায়।
অন্যদিকে ২ নম্বর আসামী মোঃ জলিল সিকদারের জবানবন্দিতে ভিন্নধর্মী কিছু তথ্য উঠে আসে। জলিল নিজেকে পেশায় দিনমজুর ও সুযোগ পেলে চুরিতে জড়িত বলে স্বীকার করে। সে দাবি করে, শাকিল ও রায়হানের কাছ থেকেই রিয়াজের বাড়িতে চুরির পরিকল্পনা শোনে। জলিলের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাদিনে তারা চারজন মিলে বাড়িতে প্রবেশ করে—সে ও নাইম উঠানে পাহারা দেয়, আর শাকিল ও রায়হান সিঁধ কেটে ভেতরে ঢোকে। কিছুক্ষণ পর ঘরের ভেতর থেকে শব্দ শুনে তারা গিয়ে দেখে রক্তাক্ত অবস্থা। জলিল দাবি করে, হত্যাকাণ্ড তার অজান্তে ঘটে এবং সে পরে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
মামলার ৪ নম্বর আসামী মোঃ রায়হানের জবানবন্দি আরও কিছু ভিন্নতা তুলে ধরে। সে স্বীকার করে, গাঁজা সেবনের সময় জলিলের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং চুরির উদ্দেশ্যে রিয়াজের বাড়িতে একাধিকবার যায়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে তারা ভাগ হয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে। শাকিল সিঁধ কেটে ভেতরে ঢোকার পর রিয়াজ টের পেলে শাকিল তাকে আঘাত করে এবং জলিলও কোপ দেয়। এরপর সবাই দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
এই জবানবন্দিগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রত্যেকেই চুরির উদ্দেশ্যকে সামনে এনেছে। তবে হত্যার মূল দায় কে নেবে—সেখানে রয়েছে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব। শাকিল বলছে জলিল ও রায়হান আঘাত করেছে, জলিল বলছে সে সরাসরি হত্যায় জড়িত ছিল না, আর রায়হান আংশিকভাবে শাকিল ও জলিলকে দায়ী করছে। অর্থাৎ প্রত্যেকে নিজের ভূমিকা আড়াল করে অন্যের দিকে দায় চাপানোর চেষ্টা করেছে—এমন ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, মামলাটি ইতোমধ্যে তদন্ত করেছেন পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), সিআইডি এবং পিবিআইসহ একাধিক সংস্থা। মোট আটজন তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করলেও কেউই এখনো পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য ও চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেননি। বরং একেকজন একেক দৃষ্টিকোণ থেকে তদন্ত করায় মামলার ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে মামলাটির তদন্তভার রয়েছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনারের ওপর। নতুন করে তদন্তে গতি এলেও আগের অসংগতি কাটিয়ে ওঠা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাত বছর পার হলেও বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে নিহত রিয়াজের পরিবারে। তাদের দাবি, প্রকৃত খুনিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই মামলা বিচারহীনতার আরেকটি নজির হয়ে থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।









































