কর না বাড়িয়ে ৬৪৭ কোটি টাকার অনুদাননির্ভর বাজেট বিসিসি’র
জুলাই ৩০ ২০২৬, ২২:৪৫
স্টাফ রিপোর্টার : কর না বাড়িয়ে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৬৪৭ কোটি ৫৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩০৯ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি)। বিশাল অঙ্কের এই বাজেটে নগর উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক-ড্রেন, আলোকায়ন, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় বড় অঙ্কের ব্যয়ের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। তবে বাজেটের আয়-ব্যয়ের ছক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিজস্ব রাজস্ব আয়ের চেয়ে উন্নয়ন ও অনুদাননির্ভর অর্থায়নের ওপরই বিসিসির বড় নির্ভরতা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকেল ৪টায় নগর ভবনে বাজেট ঘোষণা করেন বিসিসির প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। তিনি বলেন, নতুন কোনো কর না বাড়িয়েই নাগরিকসেবার মান বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
আগের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৮৫ কোটি টাকা বেশি:
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৫২০ কোটি ৮৬ লাখ ১৬ হাজার ৯২৮ টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমে দাঁড়ায় ৪৬২ কোটি ৮৬ লাখ ২২ হাজার ৮৩৭ টাকা।
অন্যদিকে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ৬৪৭ কোটি ৫৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩০৯ টাকা। অর্থাৎ সংশোধিত বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ১৮৪ কোটি ৬৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা।
বাজেটে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয় দেখানো হয়েছে ১৭৪ কোটি ৬৬ লাখ ৯২ হাজার ৬৭১ টাকা। বাকাী আয় দেখানো হয়েছে দান-অনুদানের উপর।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে-কর না বাড়িয়ে এবং সীমিত নিজস্ব রাজস্বের মধ্যে অতিরিক্ত এই অর্থের সংস্থান হবে কীভাবে?
নিজস্ব আয় বনাম উন্নয়ন ব্যয়:
বাজেটের আয় অংশে রাজস্ব আদায়, পানির বিল, ট্রেড লাইসেন্স, বিভিন্ন ফি, সম্পত্তি ও অন্যান্য খাত থেকে আয় দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অনুদান ও উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থকেও বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাবে নগর উন্নয়ন, সড়ক, ড্রেন, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো খাতে।
অর্থাৎ বিসিসির নিয়মিত নিজস্ব আয় দিয়ে পুরো বাজেটের ব্যয় নির্বাহের সুযোগ সীমিত। বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তা, প্রকল্প বরাদ্দ ও অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হবে সিটি কর্পোরেশনকে।
হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প:
বিসিসির বাজেটে জলাবদ্ধতা নিরসনে জেলখাল, আমানতগঞ্জ, সাগরদী ও লাকুটিয়া খাল পুনঃখনন এবং খালের পাড় সংরক্ষণে ৭৬৯ কোটি ৪০ লাখ টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
এর পাশাপাশি কীর্তনখোলা নদীর পশ্চিম তীরে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে রয়েছে আরও ৫৩৩ কোটি টাকার প্রকল্প।
দুটি প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় যোগ করলে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩০২ কোটি ৪০ লাখ টাকা-যা বিসিসির এক বছরের পুরো প্রস্তাবিত বাজেটের দ্বিগুণেরও বেশি।
ফলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থের পাশাপাশি সরকারি বরাদ্দই হবে প্রধান ভরসা।
পানি খাতেও বড় ব্যয়ের পরিকল্পনা:
নগরবাসীর পানি সংকট মোকাবিলায় রূপাতলী সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালু হয়েছে। বেলতলা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালুর প্রস্তুতি চলছে। ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে কীর্তনখোলা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের জন্যও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
গত অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪টি নতুন পানির সংযোগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন পানি সংযোগের আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত প্রক্রিয়া অনলাইনে নেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরে পানির এটিএম বুথ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার:
বিসিসি প্রতিদিন প্রায় ২০০ টন বর্জ্য অপসারণ করছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি আনতে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমওইউ করা হয়েছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ৪টি ডাম্প ট্রাক, একটি মেডিকেল বর্জ্যবাহী কম্প্যাক্টর ট্রাক ও একটি ভ্যাকুয়াম ট্রাক সংগ্রহ করা হয়েছে।
সড়ক-ড্রেনেও বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা:
প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পর ৪২ কিলোমিটার বিটুমিনাস কার্পেটিং সড়ক, ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার আরসিসি সড়ক, ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার সিসি সড়ক এবং ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণের তথ্য বাজেট বক্তৃতায় তুলে ধরা হয়েছে।
নগরীর আলোকায়নে প্রায় ২৪ কোটি ৭৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন হলে ১৬ হাজারের বেশি বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং ২০ হাজারের বেশি নতুন সড়কবাতি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত, রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ:
বিসিসির এবারের বাজেটের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো—নতুন কোনো কর বৃদ্ধি করা হয়নি। নাগরিকদের ওপর বাড়তি চাপ না দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত স্বস্তিদায়ক হলেও এর বিপরীতে সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ।
কারণ নগরীর সড়ক, ড্রেন, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আলোকায়নসহ নাগরিকসেবার নিয়মিত ব্যয় বহন করতে নিজস্ব রাজস্বের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সরকারি বরাদ্দ পেতে সময় লাগে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নেও নানা প্রশাসনিক জটিলতা থাকে।
ফলে ৬৪৭ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করাই এখন শেষ কথা নয়; এই অর্থের সংস্থান ও বাস্তবায়নই হবে বিসিসির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
স্মার্ট, সবুজ ও জনবান্ধব বরিশাল:
বাজেটে আগামী অর্থবছরে ৫০ হাজার বৃক্ষরোপণ, পার্ক উন্নয়ন, নতুন ফোয়ারা, আলোকসজ্জা, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ মার্কেট, কর্মজীবী নারীদের হোস্টেল, শিশুদের জন্য গ্রীন সিটি পার্ক সংস্কার এবং তিনটি জোনে নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
কর আদায়, ট্রেড লাইসেন্স, ভবনের নকশা অনুমোদন ও ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন নাগরিকসেবা অনলাইনে নেওয়ারও উদ্যোগ রয়েছে।
প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও অপচয় রোধের মাধ্যমে নাগরিকসেবার মান বাড়ানো হবে। কর বৃদ্ধি না করেও নগরবাসীকে আগের চেয়ে বেশি নাগরিক সুবিধা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।
তবে বাজেটের অঙ্ক যত বড়ই হোক, নিজস্ব রাজস্ব আয় সীমিত রেখে অনুদান ও সরকারি প্রকল্পের অর্থের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ঘোষিত উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে দৃশ্যমান করাই এখন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।







































