পাথরঘাটায় নৌ পুলিশের ভয়ংকর চাঁদাবাজি

জুলাই ২৬ ২০২৬, ২২:৫৪

বরগুনা প্রতিনিধি : বরগুনার পাথরঘাটা সংলগ্ন বিষখালী-বলেশ্বর নদীতে যেতে হয় পাথরঘাটা জুড়ে ১২ কিলোমিটার বাড়ানি খাল থেকে। আর এ ভাড়ানী খাল থেকে এই এলাকার প্রায় ৪০ হাজার জেলে পাশ্ববর্তী নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে যায়। এ খাল থেকে যেতে প্রতিনিয়ত নৌ-পুলিশ ফাড়িকে ট্রলার প্রতি ২৫শ থেকে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়। দীঘ বছর ধরে এরকম গুঞ্জন থাকলেও এর কোন সত্যতা পাওয়া যাচ্ছিল না।

এ নিয়ে সংবাদিকরা অনুসন্ধানে নামলে বেরিয়ে আসে সকল তথ্য। টাকা গ্রহনের একাধীক কল রেকর্ড এবং ভিডিও হাতে আসে। ঘুষের বিষয়ে পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ গজনবীর কাছে কাছে বক্তব্য নিতে গেলে তিনি বিসয়টি অস্বীকার করলেও তার সামইে সাংবাদিকদের মোবাইল ফোনও কেড়ে নেয়ার চেস্টা করেন আসাদুল নামের এক পুলিশ সদস্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের সর্ব দক্ষিণের জেলা বরগুনা, এই বরগুনার নদীবেষ্ঠিত উপজেলা পাথরঘাটা। যার পূর্বে বিষখালী পশ্চিম বলেশ্বর এবং দক্ষিণ এ বিশাল বঙ্গোপসাগর। এছাড়াও বলেশ্বর ও বিষখালী নদীকে সংযুক্ত করেছে পাথরঘাটার ১২ কিলোমিটার বাড়ানি খাল। প্রতিদিন এই নৌ পথে দিয়ে চলাচল করে শত শত মাছ ধরার ট্রলার, স্টিল বডি ট্রলার, ছোট জাহাজসহ বিভিন্ন নৌযান।

আর এই পথেই দীর্ঘদিন ধরে চরদুয়ানী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির নামে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করছেন জেলে ও কাঠ ব্যবসায়ীরা ও ট্রলার মালিকরা। এই অঞ্চলের মানুষ অধিকাংশই জেলে পেশা সাথে নিয়োজিত। এই নদী ও সমুদ্রে জীবনের সাথে যুদ্ধে নেবে মাস শিকার করলেও কুলে ফিরে এসে প্রতিক্রিপেই নৌ পুলিশ ফাঁড়িকে ২৫শ থেকে ৩ হাজার টাকা করে দিতে হয়।

তাছাড়া এ পাথরঘাটা রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। সকল জেলেরা মাছ শিকার করে এই মৎস্য ঘাটে বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। এখানে বিক্রি করে নদী বঙ্গবসাগরে মাছ শিকার যেতে হলে তাদেরকে টাকা দিয়ে যেতে হয়। তাদের নির্ধারিত অংকের টাকা না দিলে মামলা হামলা তলার নিলাম এবং বৈধ কালকে অবৈধ বলে পুড়িয়ে ফেলা হয়। বিভিন্ন সময়ে কে অবৈধ বলেও কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। জেলেদের।

আজাদ ও সোহেল নামে এক কাঠ ব্যবসায়ী বলেন, আমরা প্রতি মাসে কয়েকবার এই খাল দিয়ে চলাচল করি। বিভিন্ন গ্রামগঞ্জ থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে খুলনা, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করতে নিয়ে যাই নদী পথ দিয়ে। বিভিন্ন সময় প্রতি ট্রিপে জাহাজ প্রতি দিতে হয় ২০০০ টাকা থেকে ৩০০০ হাজার টাকা। এক এক টিরিপে আমি একা নয় এরকম অনেক ভুক্তভোগী রয়েছেন কাঠ ব্যবসায়ী, আমরা চাই এই চাঁদাবাজি বন্ধ হোক।

জেলে জাকির হোসেন এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরো অনেকে জানান, ছোট কাঠের নৌকা এবং স্টিল বডি ট্রলার থেকে মাসে দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা, মাছ ধরার ট্রলার থেকে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা এবং বড় নৌযান থেকেও নির্ধারিত অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়।

টাকা না দিলে মামলা, হয়রানি কিংবা নৌযান আটকে দেওয়ার ভয় দেখানোরও অভিযোগ রয়েছে। উপজেলায় দুটি মৎস্য বন্দর এর একটি মৎস্য বন্দর চরদুয়ানী বাজারে অবস্থিত। যার কারণে জেলেদের চলাচল অনেক বেশি। খালের দুই মাথায় দুই নদী এবং উপজেলার একমাত্র নদীপথে চলাচলের মাধ্যমেই খাল, এই খালের শেষ মাথায় রয়েছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত এএসআই কবিরের বক্তব্য নিতে চরদুয়ানি পুলিশ ফাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে কল করে জেলেদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দুরে আছেন বলে ফোন কেটে দেন। পরে আবারো মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেস্টা করলে তাকে আর পাওয়া যায়নি।

চরদুয়ানী নৌ-পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ মো. গজনবীর কাছে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করে বলেন, এরকম কোন চাদা নেয়ার বিষয়ে তার জানা নেই। ভিডিওতে টাকা লেনদেনের বিষয় এবং একাধীক কল রেকর্ড দেখিয়ে তার নাম বলে টাকা গ্রহন করেছে কেন? এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এটা তার জানা নেই, এরকম করে থাকলে তার বিরুদ্ধ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

পাথরঘাটা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হক বলেন, জেলেদের কাছ থেকে নৌ-পুলিশের টাকা নেওয়ার বিষয়টি আমরা সবসময় মুখে মুখে শুনি। তবে বিষয়টি এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে ধরা পড়েনি। আপনার থেকে যখন ভিডিও দেখেছি বিষয়টি নিয়ে আমি উজেলা মিটিংয়ে উত্থাপন করবো। যাতে করে এই অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবি ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, আমাদের জেলেদের কাছ থেকে সব সময়ই অসাধু নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তারা টাকা নিয়ে থাকেন, বিষয়টি নতুন কিছু নয়। তাদেরকে টাকা দিতে না পারলে মাছ শিকার করতে দেয়া হয় না এবং বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করেন। জেলেরা এমনিতেই নিঃস্ব হয়ে গেছে এর উপরে, মরার উপর খরার গা। যেখানে জেলেদের নিরাপত্তার জন্য রাখা হয়েছে নৌ-পুলিশের ফাড়ি, সেখানে রক্ষকই বক্ষক। আমরা এই অসাধু নৌ-পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুপ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি যাতে করে জেলেদের উপর আর কেউ জুলুম করতে না পারে।