এক বেডে তিন শিশু; প্লাস্টিকের পটেই অক্সিজেন সরবরাহ
শেবাচিম হাসপাতালে ৪০ শয্যার শিশু বেডে ৩৪৯ রোগীর চিকিৎসা
এপ্রিল ২১ ২০২৬, ২০:০০
ফাহিম ফিরোজ, বরিশাল : চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, কিন্তু ভেতরের দৃশ্য যেন এক মানবিক বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি। বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে অসহায় শিশুদের গাদাগাদি ভিড়, কান্না আর স্বজনদের উদ্বেগে ভরা মুখ। ৪০ শয্যার একটি ওয়ার্ডে ঠাঁই নিয়েছে ৩৪৯ শিশু—এক বেডে দুই থেকে তিনজন, আর বাকিরা মেঝে ও বারান্দায়। সংক্রমণের ঝুঁকি, চিকিৎসা সংকট আর অব্যবস্থাপনার মধ্যেই চলছে তাদের বেঁচে থাকার লড়াই।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র—অক্সিজেনের জন্যও নেই ন্যূনতম আধুনিক ব্যবস্থা। প্রয়োজনীয় যন্ত্রের অভাবে প্লাস্টিকের পট কেটে তৈরি করা অস্থায়ী হেডমাস্ক দিয়েই দেওয়া হচ্ছে অক্সিজেন, যা পুরো পরিস্থিতিকে আরও শঙ্কাজনক করে তুলেছে। ৪০ শয্যার ওয়ার্ডটিতে চিকিৎসা নিচ্ছে ৩৪৯ শিশু। যা ধারণক্ষমতার প্রায় নয় গুণ বেশি।
সোমবার (২০ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, ওয়ার্ডের প্রতিটি বেডে দুই থেকে তিনজন শিশু গাদাগাদি করে শুয়ে আছে। অনেক শিশুর ঠাঁই হয়েছে মেঝে, বারান্দা ও চলাচলের পথেও। সংক্রমণের ঝুঁকি উপেক্ষা করে একই জায়গায় রাখা হচ্ছে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদের।
সবচেয়ে শঙ্কাজনক চিত্র—অক্সিজেন সংকট। যেখানে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আধুনিক অক্সিজেন হুড থাকা জরুরি, সেখানে গৃহস্থালির প্লাস্টিকের পট কেটে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী হেডমাস্ক। সেই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থাতেই চলছে অক্সিজেন সরবরাহ। যা শুধু অপ্রতুল নয়, বরং চিকিৎসার নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৩৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে ভর্তি রয়েছে প্রায় ৩৩৯ জন। এর মধ্যে হাম আক্রান্ত শিশু রয়েছে ১৩৬ জন। সংক্রামক এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের অন্য রোগীদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে রাখায় সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
চিকিৎসক সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। বর্তমানে শিশু ওয়ার্ডে কর্মরত আছেন মাত্র ৮ জন চিকিৎসক। চলতি মাসেই আরও ৪ জন বদলি হলে চিকিৎসাসেবা কার্যত ভেঙে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এক বেডে দুই শিশুর চিকিৎসা নেওয়া নগরীর রুপাতলীর সোনিয়া বেগম বলেন,“বেড না থাকায় বাবুগঞ্জ থেকে আসা আরেকটা বাচ্চার সঙ্গে একই বেডে থাকতে হচ্ছে। বাচ্চাদের ঠিকমতো রাখা যায় না, চিকিৎসাও ঠিকভাবে হচ্ছে না। খুব কষ্টে আছি।”
শিশু বিভাগের প্রধান ডা. বিকাশ চন্দ্র নাগ মানবকণ্ঠকে বলেন, “রোগীর চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। সীমিত জনবল ও সরঞ্জাম দিয়ে সেবা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।”
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মশিউল মুনির মানবকণ্ঠকে বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।”
তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ, কমছে চিকিৎসার সক্ষমতা। প্রয়োজনীয় বেড, চিকিৎসক ও আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
স্বাস্থ্যসেবার এমন নাজুক চিত্র শুধু একটি হাসপাতালের সংকট নয়—এটি পুরো দক্ষিণাঞ্চলের জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। দ্রুত জরুরি ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।










































