প্রতি মাসে গড়ে ১৩ জনের বেশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন
বরিশালে ছয় মাসে ৭৯ নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার
জুলাই ২৩ ২০২৬, ২৩:১৩
ফাহিম ফিরোজ : বরিশালে নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপত্তাহীনতা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। ধর্ষণ যেন এখন বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, বরং উদ্বেগজনক সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। শিশু থেকে গৃহবধূ—কেউই রেহাই পাচ্ছেন না যৌন সহিংসতার হাত থেকে। কখনো অপহরণ করে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, কখনো বিয়ের প্রলোভনে, আবার কখনো প্রভাব-প্রতিপত্তি ব্যবহার করে নারীদের সম্ভ্রম লুণ্ঠনের অভিযোগ উঠছে। একের পর এক আলোচিত ঘটনা ঘটলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্য না থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় এলেও বিচার দীর্ঘসূত্রিতায় পড়ায় অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
বরিশাল জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে ৭৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ১৩ জনের বেশি নারী ও শিশু এ নৃশংস অপরাধের শিকার হচ্ছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ১১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১০ জন, মার্চে ৮ জন, এপ্রিলে ১৬ জন, মে মাসে সর্বোচ্চ ২০ জন এবং জুনে ১৪ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হন। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে মার্চের ৮টি ঘটনা বেড়ে মে মাসে ২০টিতে পৌঁছানো পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে।
শুধু সংখ্যাই নয়, অপরাধের ধরনও উদ্বেগজনকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। শিশুদের অপহরণ করে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘদিন শারীরিক সম্পর্কের পর ধর্ষণের অভিযোগ, নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল এবং ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অপরাধ করার মতো ঘটনাও বাড়ছে। এতে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
চলতি বছরের ১০ জুলাই নগরীর খোন্তাখালী এলাকার একটি মাদ্রাসার ১৩ বছর বয়সী ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে জোরপূর্বক অপহরণ করে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি পুরো বরিশালজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে চারজনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা হলে পুলিশ ও র্যাব-৮ যৌথ অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত মো. রুহুল আমিন ও মো. সাঈদকে গ্রেপ্তার করে।
এর মাত্র কয়েকদিন পর, ২০ জুলাই মুলাদীতে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে ছাত্রদল নেতা জাহিদ খলিফাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি বিয়ের প্রলোভনে এক গৃহবধূকে ধর্ষণ, সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ এবং তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগে বরিশাল সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম উজ্জ্বলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, ধর্ষণের অভিযোগ শুধু বখাটে বা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধেই নয়; বিভিন্ন পেশা ও পরিচয়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও উঠছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক নারী ও শিশু সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ কিংবা বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় অভিযোগই করেন না। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বরিশাল জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আযাদ আলাউদ্দীন বলেন,”ধর্ষণের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেবল মামলা দায়ের বা গ্রেপ্তার করলেই হবে না। দ্রুত তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় রোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয়-সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।”
বরিশাল মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মেহেরুন নাহার মুন্নি বলেন,”নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তবে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবার, সমাজ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও গণমাধ্যম—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা, মানসিক কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা আরও জোরদার করা জরুরি।”
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ধর্ষণ প্রতিরোধে শুধু গ্রেপ্তার বা মামলা নয়, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, সাক্ষী সুরক্ষা, ভুক্তভোগীবান্ধব তদন্ত, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে এই ভয়াবহ অপরাধ আরও বিস্তার লাভ করতে পারে এবং সমাজে নিরাপত্তাহীনতা আরও গভীর হবে।










































